জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোয় বাড়ছে দুর্যোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেড়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা বাড়ছে। বিভিন্ন রোগবালাই ও স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর সমস্যা যুক্ত হওয়ায় দুর্যোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে গেছে।

এরই মধ্যে এই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইএফআরসি)। সংস্থাটি বলছে, এই অঞ্চল মোট আট ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে।

৯ আগস্ট বুধবার সংস্থাটি বাংলাদেশের ঢাকা, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর ও চীনের বেইজিং থেকে একযোগে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ডেঙ্গু ও ঘূর্ণিঝড়ের সমস্যায় পড়েছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাতেও ডেঙ্গু সমস্যা তীব্র হয়েছে। মঙ্গোলিয়ায় একই সঙ্গে বন্যা ও শৈত্যপ্রবাহ এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বন্যার আঘাত দেশগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গে আইএফআরসি ডেঙ্গু মোকাবিলায় গভীরভাবে কাজ করছে জানিয়ে আইএফআরসি বাংলাদেশ প্রধান সময় কারনে বলেন, এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালের অধিবাসীদের সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে দেখছি। ওই ৩ শহরের ৮৫টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুপ্রবণ বা হটস্পট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। জীবনরক্ষার জন্য আমরা সব কটি এলাকায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব সমস্যা আরও তীব্রতর হতে পারে। এতে ওই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা আরও তীব্রতর হতে পারে। মূলত প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় এল নিনো নামে আবহাওয়ার এক বিশেষ অবস্থা তৈরি হওয়ায় ওই সমস্যা বাড়তে পারে। এল নিনো তৈরি হলে ওই সাগরের মাঝ বরাবর একটি উষ্ণ স্রোত তৈরি হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা থেকে গত চার জুন প্রকাশ করা এল নিনোবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর এ বছর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়েছে। এতে দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হবে। আর অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য আমেরিকায় খরা হতে পারে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া মূলত খরা পরিস্থিতি থাকলেও সেখানে হঠাৎ তীব্র বৃষ্টি বেড়ে পাহাড়ধস ও শহরে জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তন আর এল নিনো আনছে বড় ঝুঁকি শীর্ষক পুরো প্রতিবেদন পড়ুন প্রথম আলোয়

এল নিনো কী?

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে কমবেশি জানা থাকলেও অনেকের কাছেই এল নিনো নতুন।

স্প্যানিশ শব্দ ‘এল নিনো’র অর্থ হলো ‘লিটল বয়’ বা ‘ছোট ছেলে’। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকে, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। এর বিপরীত অবস্থার নাম ‘লা নিনা’, যার অর্থ ‘লিটল গার্ল’ বা ‘ছোট মেয়ে’। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে লা নিনা বলা হয়।

আরও ভালোভাবে বলতে গেলে- পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে পেরু, ইকুয়েডর বরাবর কোনও কোনও বছর ডিসেম্বর মাস নাগাদ এক প্রকার উষ্ণ দক্ষিণমুখী স্রোতের সৃষ্টি হয়। এরই নাম এল নিনো। পেরু, ইকুয়েডর উপকূলেই মাঝেমাঝে এল নিনোর বিপরীত একটি শীতল স্রোত সৃষ্টি হয়। তার নাম লা নিনা। দুই স্রোতের প্রভাব পড়ে বিশ্বের আবহাওয়ায়।

এল নিনো কীভাবে প্রভাব ফেলে


দুটি মূল উপাদান রয়েছে – প্রথমটি হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে থেকে ক্রমাগত উচ্চ স্তরের কার্বন নির্গমন যা মহামারী চলার সময় কমলেও এখন বাড়ছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা হলো এল নিনোর সম্ভাব্য উপস্থিতি। আবহাওয়ায় এল নিনো সক্রিয় থাকলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উষ্ণতা বাড়ে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত তিন বছর ধরে বিশ্ব একটি লা নিনা’র মুখোমুখি হচ্ছে যা জলবায়ু উষ্ণায়নকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বে যে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হবে তার প্রভাবে আগামী বছর উষ্ণতা বাড়বে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এ বিষয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কী প্রভাব ফেলবে

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল তার থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরণের বিপদ এড়ানো যাবে। তা না পারলে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন।

অনেক বিজ্ঞানীর আশঙ্কা যে ভয়ঙ্কর এই পরিণতি ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই। বিশ্বের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এর প্রভাব বিশ্বের একেক জায়গায় একেক রকম হবে:

ব্রিটেনে বৃষ্টিপাতের মাত্রা প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়ে ঘনঘন বন্যা হবে। সাগরের উচ্চতা বেড়ে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ছোট অনেক দ্বীপ বা দ্বীপরাষ্ট্র বিলীন হয়ে যেতে পারে।

আফ্রিকার অনেক দেশে খরার প্রকোপ বাড়তে পারে এবং পরিণতিতে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায, বাংলাদেশ, ভারতে অতিরিক্ত গরম পড়তে পারে এবং খরার প্রকোপ দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top