
বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সংশোধিত আইনটি নতুন নামে আসছে। সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ আনার সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারার পরিবর্তন এনে নতুন আইন করা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনে মোট ধারা থাকছে ৬০টি।
শুরু থেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন রাজতৈনিক দল, লেখক-সাংবাদিক সমাজ ও অ্যাকটিভিস্টরা। মূলত ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তথ্যপ্রযুক্তি আইন (আইসিটি) বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। তবে সেই আইনটি বাতিল করলেও আরও কঠিন ধারা নিয়ে সামনে আসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম হচ্ছে ২১ ধারা। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোন ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো রকম প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালায় বা তাতে মদদ দেয় তাহলে সেটি অপরাধ বলে গণ্য হতো এবং এর জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
এই একই অপরাধ কেউ দ্বিতীয়বার করলে তার সাজা দ্বিগুণ করার বিধান ছিল। আর বারবার একই অপরাধের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
এই ধারাটিতে পরিবর্তন এনে সাজার মেয়াদ ৭ বছর করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলেও সাজা দ্বিগুণ হবে না।
৪৩ ধারা নিয়ে বড় বিতর্ক থাকলেও সেটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন যে, কোনো স্থানে এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাহলে সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছে ফেলা, পরিবর্তন হওয়ার বা করার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে তার, কোনো ধরনের পরোয়ানা ছাড়াই সেখানে তল্লাশি, সরঞ্জাম জব্দ, দেহ তল্লাশি, এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের এখতিয়ার রয়েছে।
এটি অপরিবর্তিত রাখার যুক্তি হিসেবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে, এসব অপরাধ যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে করা হয় সেটা জব্দ না করলে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেকারণে এটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার পর পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে তারা সন্তুষ্ট হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, তারা সন্তুষ্ট হবে কিনা সেটা তাদের বিষয়। আমরা সকলেই বসে দেখেছি যে, এই আইনটা যে উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল সেটা যাতে পূরণ করা যায় সেটার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আইনের ২৮, ২৯, ৩০ ধারাগুলো বাতিলের বিষয়ে নানা সময়ে আহ্বানও জানানো হয়েছে। এই ধারাগুলো বাতিল করা না হলেও সেগুলোতে সংশোধন আনা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা সবসময়ই বলেছি যে বাতিল করা যাবে না। এগুলো সংশোধন করা হবে এবং সেটাই করা হয়েছে।
২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করা বা উসকানি দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করে, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহলে তা অপরাধ হবে। এই অপরাধের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর কারাদণ্ড, বা দশ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। একই অপরাধ বার বার করলে সাজা ও জরিমানার মেয়াদ দ্বিগুণ হওয়ার বিধান ছিল।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, এই ধারায় সাজা কমানো হয়েছে। এটা আগে ছিল অ-জামিনযোগ্য। এটা জামিন-যোগ্য করা হয়েছে।
২৯ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তাহলে তিনি তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এ ছাড়া একই অপরাধ আবার করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
এই ধারায় পরিবর্তন এনে কারাদণ্ডের যে সাজা ছিল সেটাকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখানে শাস্তি হবে শুধু জরিমানা। আর জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সর্বোচ্চ জরিমানা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হবে। দেওয়ানি আইনে কেউ মানহানির জন্য মামলা করলে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কোনো সীমা নাই। তিনি চাইলে ১০০ কোটি টাকাও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। তবে সেটা কমিয়ে সর্বোচ্চ আদায় যোগ্য জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। তবে কত টাকা জরিমানা করা হবে তা নির্ধারণ করবে আদালত।
মানহানির মামলায় এখন যেহেতু কোনো কারাদণ্ড নাই, তাই এই ধারায় কাউকে গ্রেফতারও করা যাবে না বলে জানান আইনমন্ত্রী।
৩১ ধারায় আগে উল্লেখ ছিল, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ৭ বছর এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। একাধিক বার একই অপরাধ করলে সাজা বেড়ে ১০ বছর এবং জরিমানা ১০ লাখ টাকা করার বিধান ছিল।
এই ধারায় পরির্বতন এনে সাজার সময়সীমা কমানো হয়েছে। আগে সাত বছরের কারাদণ্ডের পরিবর্তে এটা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। বার বার একই অপরাধ করলে সাজা বাড়ানোর বিষয়টি বাতিল করা হয়েছে।
৩২ ধারায় সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধের শাস্তি আগে ছিল ১৪ বছর, সেটি কমিয়ে ৭ বছর করা হয়েছে। বারবার এই অপরাধ করলে সাজা বাড়ানোর বিধান বাতিল করা হয়েছে।
৩৩ ধারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে হ্যাকিং সম্পর্কিত অপরাধ নামে নতুন ধারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
হ্যাকিং হচ্ছে, কম্পিউটার তথ্য ভাণ্ডারের কোনো তথ্য বিনাশ, বাতিল বা পরিবর্তন বা তার মূল্য বা উপযোগিতা কমানো বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিসাধন বা নিজ মালিকানা বা দখল বিহীন কোন কম্পিউটার, সার্ভার, নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশের মাধ্যমে তার ক্ষতিসাধন হবে হ্যাকিং।
৩৩ ধারায় বলা ছিল, যদি কোনো ব্যক্তি কম্পিউটার বা ডিজিটাল সিস্টেমে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক সংস্থার কোনো তথ্য-উপাত্তের কোনো ধরণের সংযোজন বা বিয়োজন, স্থানান্তর বা স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তা অপরাধ বলে ধরা হবে।
এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যাচ্ছে, আসছে সাইবার নিরাপত্তা আইন
- মানহানির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কারাদণ্ড নয়, জরিমানার বিধান থাকবে: আইনমন্ত্রী
- বদলে যাচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নাম
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ‘দ্রুত’ সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী
- বিশেষ সাক্ষাৎকার: ইমোন গিলমোর—নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা এখন ৭ হাজার
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অবিলম্বে স্থগিত করুন: জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান
- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার হচ্ছে: প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান
- কথা বলতে ‘না দিতেই’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: ফখরুল
- বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আমেরিকার চেয়ে ‘সহজ’: তথ্যমন্ত্রী



