নুুরের উপর যত গুরুতর হামলা

সম্প্রতি হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাথায় আঘাত রয়েছে, নাক ও চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই হামলা ব্যাপক সমালোচনা তৈরি করেছে। এটাই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন নুর।

নুরুল হক নুরের ছবিটি বিবিসি বাংলার ভিডিও থেকে নেওয়া

নুরুল হক নুর ২০১৮ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি একজন সাধারণ ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে তার অপ্রত্যাশিত জয়লাভ রাজনৈতিক অঙ্গনে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করে। পরবর্তীতে তিনি ‘গণ অধিকার পরিষদ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বিস্তৃত হয়েছে, আক্রমণের ধরন এবং কৌশলও ততই পরিবর্তিত হয়েছে।

নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনাগুলোকে প্রধানত পাঁচটি পর্বে বিশ্লেষণ করে: কোটা সংস্কার আন্দোলন, ডাকসু নির্বাচন ও তৎপরবর্তী সময়, আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সংঘাত, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নিপীড়ন এবং সাম্প্রতিক সংঘাত। প্রতিটি হামলায় জড়িত অভিযুক্তদের পরিচয়, কারণ, আঘাতের ধরন এবং এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি গ্রেফতার, আইনি হয়রানি এবং রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণ করে যে তার ওপর নিপীড়ন শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কাঠামোকেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

নুরুল হক নুরের উপর হামলা: একটি ভিজ্যুয়াল টাইমলাইন

নুরুল হক নুরের উপর হামলা

২০১৮ থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটি ভিজ্যুয়াল টাইমলাইন

ন্যূনতম নথিভুক্ত হামলা

12+

এই ইনফোগ্রাফিকে শুধুমাত্র গুরুতর এবং বহুল প্রচারিত হামলাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বছর অনুযায়ী হামলার প্রবণতা

রাজনৈতিক অঙ্গনে তার সক্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে হামলার সংখ্যাও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে।

হামলার জন্য অভিযুক্ত পক্ষসমূহ

বিভিন্ন সময়ে হামলার জন্য মূলত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়ী করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য হামলার টাইমলাইন

৩০ জুন, ২০১৮

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার উপর হামলা চালায়।

১১ মার্চ, ২০১৯

ডাকসু নির্বাচনের দিন রোকেয়া হল কেন্দ্রে পরিদর্শনের সময় তিনি ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের দ্বারা হামলার শিকার হন।

২২ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডাকসু ভবনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা এক নৃশংস হামলায় নুর এবং তার সহযোগীরা গুরুতরভাবে আহত হন।

১৪ অক্টোবর, ২০২০

ধর্ষণের বিরুদ্ধে এক সমাবেশে যোগ দিতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি আবারও ছাত্রলীগের দ্বারা হামলার শিকার হন।

২৬ মার্চ, ২০২১

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিরুদ্ধে মতিঝিলে এক বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সম্মিলিত হামলার শিকার হন।

১ আগস্ট, ২০২২

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আয়োজিত এক সমাবেশে ছাত্রলীগের কর্মীরা তার উপর হামলা চালায়।

২ আগস্ট, ২০২৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে গেলে তিনি হামলার শিকার হন।

জুলাই, ২০২৫

গণ অধিকার পরিষদের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যরা তার উপর চড়াও হয়।

এই ইনফোগ্রাফিকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

প্রথম পর্ব: কোটা সংস্কার আন্দোলন (২০১৮)

এই পর্বের হামলার মূল প্রেক্ষাপট ছিল ২০১৮ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এই আন্দোলন তাকে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

৩০ জুন ২০১৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে হামলা

কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে আন্দোলনকারীরা ২০১৮ সালের ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে। এই সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগেই ছাত্রলীগের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তৎকালীন কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হাসান আল মামুনের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা নুরুল হক নুরকে মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি লাথি ও ঘুষি মারে, যেন তিনি একটি ফুটবল। এই নির্মম হামলায় তার হাতের একটি আঙুল ভেঙে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রায় ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়।

এই হামলাটি নুরের রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ছিল। হামলার লাইভ ভিডিও সারাদেশে ভাইরাল হয়, যা আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি করে এবং তাকে একজন মজলুম নেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়। এই ঘটনা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাকে “জনতার নুর” হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি স্থাপন করে। এই ঘটনাটিই প্রথমবার রাজনৈতিক মতবিরোধের জেরে শারীরিক সহিংসতা ব্যবহারের একটি প্যাটার্ন প্রতিষ্ঠা করে, যা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় পর্ব: ডাকসু নির্বাচন ও তৎপরবর্তী সময় (২০১৯)

২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে তার অপ্রত্যাশিত জয়লাভ এবং এর পরপরই তার ওপর একাধিক হামলা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল। এই হামলাগুলো প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিজয় অর্জন করলেও মাঠের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তখনও তার প্রতিপক্ষদের হাতেই ছিল।

১১ মার্চ ২০১৯, রোকেয়া হলে হামলা

ডাকসু নির্বাচনের দিন, ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে প্রতিবাদ করতে গেলে নুরুল হক নুর রোকেয়া হলে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। এই হামলার পর তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি শুয়ে তার ভিপি পদে জয়ের খবর পান।

১২ মার্চ ২০১৯, টিএসসিতে হামলা

ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পরের দিন, ২০১৯ সালের ১২ মার্চ হাসপাতাল থেকে ক্যাম্পাসে এলে টিএসসিতে তাকে আবার হামলার শিকার হতে হয়। সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই এই হামলা চালায়। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা ছাত্রদল নেতা তৌহিদুর রহমানও এ সময় হামলার শিকার হন এবং তার মাথা ফেটে যায়। এই ধারাবাহিক হামলাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ডাকসুর ভিপি পদে বিজয়ের মতো একটি গণতান্ত্রিক ফলাফলও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগ মনোনীত ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন তাকে অভিনন্দন জানালে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কিছুটা অবসান হয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, হামলাগুলো হয়তো উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার ফল ছিল।

তৃতীয় পর্ব: আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সংঘাত (২০১৯)

ডাকসু ভিপি হিসেবে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত হতে থাকে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে তিনি আক্রমণের শিকার হন। এই পর্বে হামলাকারীদের তালিকায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মতো নতুন সংগঠনের নামও উঠে আসে, যা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বিস্তার নির্দেশ করে।

২৬ মে ২০১৯, বগুড়ায় হামলা

ছাত্র অধিকার পরিষদের ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে গিয়ে ২০১৯ সালের ২৬ মে বগুড়া শহরে নুরুল হক নুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তিতাসের নেতৃত্বে হামলার শিকার হন। এই হামলায় নুরসহ তার সংগঠনের প্রায় পাঁচজন কর্মী আহত হন এবং তাদের চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনা হয়।

১৪ আগস্ট ২০১৯, পটুয়াখালীতে হামলা

ঈদের ছুটিতে নিজ এলাকা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া বাজারে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় তিনি আহত হন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এবং পরে পটুয়াখালী ত্যাগ করতে সহায়তা করে।

১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, রাজু ভাস্কর্যে হামলা

ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নুরুল হক নুর ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের হামলার শিকার হন। এই হামলার নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি ও ছাত্রলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এই হামলায় নুরের বাম হাতের একটি আঙুল ভেঙে যায়।

২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ডাকসু ভবনে হামলা

এই হামলাটি ছিল ২০১৯ সালের মধ্যে তার ওপর সবচেয়ে গুরুতর আক্রমণ। ডাকসু ভবনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের হামলায় নুরসহ মোট ২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত নুরসহ চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং একজনকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

এই সময়কালে হামলাকারীদের পরিচয় পরিবর্তিত হয়। শুধু ছাত্রলীগ নয়, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মতো অন্যান্য সংগঠনকেও তার ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আরও সুসংগঠিত এবং বহুমুখী হয়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরেও তার ওপর হামলা প্রমাণ করে যে তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত হচ্ছে এবং তার বিরোধী দলগুলো তাকে জাতীয়ভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।

চতুর্থ পর্ব: রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নিপীড়ন (২০২০-২০২৪)

২০২০ সালের পর থেকে নুরুল হক নুরের উপর নিপীড়নের ধরন পরিবর্তিত হয়। শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে তাকে হেনস্তা ও দমন করার একটি নতুন ধারা লক্ষ্য করা যায়।

২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, ধর্ষণের অভিযোগের ভিত্তিতে আটক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর করা ধর্ষণের মামলায় শাহবাগ থেকে নুরসহ সাতজনকে আটক করা হয় । যদিও কয়েক ঘণ্টা পর মুচলেকা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় পুনরায় গ্রেফতার

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় নুরকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয় এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়। নুর অভিযোগ করেন যে রিমান্ডে তাকে “বর্বরোচিত নির্যাতন” করা হয়েছে। মামলার এজাহারে তার বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ করা হয়।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, রাজপথের শারীরিক আক্রমণ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার একটি কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগগুলো এই কৌশলের অংশ। এই ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করে যে, এটি প্রকৃত অপরাধ দমনের উদ্দেশ্য নাকি রাজনৈতিক হয়রানির একটি ভিন্ন রূপ। রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্নমতের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর ব্যবহারের একটি উদাহরণ।

পঞ্চম পর্ব: সাম্প্রতিক সংঘাত ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ভূমিকা (২০২৫)

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি এখন একজন পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নেতা। তার ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলো দলীয় কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর সাথে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

২৯ আগস্ট ২০২৫-এর সাম্প্রতিক হামলা

এই দিন কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণ অধিকার পরিষদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এর একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতির সময় বিজয়নগরে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর লাঠিচার্জে নুর আহত হন। গণ অধিকার পরিষদের অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, এমন হামলা অতীতে আওয়ামী লীগের আমলেও কোনো নেতার ওপর হয়েছে বলে জানা নেই।

এর বিপরীতে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। তারা আরও জানায় যে, পুলিশ প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং কিছু সদস্য আহত হন। আইএসপিআর-এর আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “মব ভায়োলেন্স” থামাতে সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়।

এই হামলায় নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। জানা যায় যে তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে এবং ডান চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার মাথায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে, তবে তা সামান্য। হামলার পর রাশেদ খান সাংবাদিকদের বলেন যে নুর “মুমূর্ষু অবস্থায়” আছেন এবং “বাঁচবে কি মরবে জানি না”।

এই হামলাটি একটি নতুন এবং উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে, যেখানে শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ সরাসরি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে উঠেছে। গণ অধিকার পরিষদের অভিযোগ এবং আইএসপিআরের বিবৃতির মধ্যেকার সরাসরি দ্বন্দ্ব প্রমাণ করে যে, শুধু মাঠের সহিংসতা নয়, বরং ঘটনার আখ্যান (narrative) নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও একটি তীব্র রাজনৈতিক যুদ্ধ চলছে। আইএসপিআর-এর বিবৃতি একটি প্রতিরোধমূলক ভূমিকা তুলে ধরে, যেখানে গণ অধিকার পরিষদের বিবৃতি এটিকে একটি পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে চিত্রিত করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিবৃতি অনুযায়ী, এই হামলা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ, যা একটি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে যেখানে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দিকেও ধাবিত হচ্ছে।

হামলাগুলো ভিন্নমত দমনে ক্ষমতার অপব্যবহার

নুরুল হক নুরের উপর হামলাগুলো কেবল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের একটি প্রতিচ্ছবি। তার রাজনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে হামলাকারীদের ধরন এবং নিপীড়নের কৌশলও পরিবর্তিত হয়েছে। ছাত্রনেতা হিসেবে তার উপর হামলাগুলো ছিল মূলত সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যা তার রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত হলে হামলাকারীদের তালিকায় নতুন সংগঠনের নাম যুক্ত হয় এবং নিপীড়নের কৌশল হিসেবে শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ব্যবহার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ হামলায় আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ একটি নতুন এবং গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top