আফস্পা: একটি বৈধ অস্ত্র

কে এস সুব্রামানিয়ান

মণিপুরে ধর্ষণ ও হত্যার কাহিনি এখন ব্যাপকভাবে পরিচিত। আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্টের (আফস্পা) বলে আধা সামরিক কর্তৃপক্ষ আসাম রাইফেলস প্রায়ই এসব অপরাধ করে থাকে। তাই এই লেখায় আমি পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত নয়, শুধু নাগাল্যান্ড নিয়ে কথা বলব।

আফস্পা হলো এমন এক আইন, যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো ‘অশান্ত এলাকা’য় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশেষ ক্ষমতা দেয়। এই আইনের আওতায়, সশস্ত্র বাহিনীকে গুলি চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো অপরাধের সন্দেহ হলে, ওয়ারেন্ট ছাড়াই কোথাও ঢুকতে পারে, তল্লাশি করতে পারে এবং প্রয়োজনে যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র বাহিনীকে আইনি রক্ষাকবচ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে আফস্পা আইনে। 

ফলে ব্যাপক অপপ্রয়োগ হয়েছে এবং হচ্ছে এ আইনের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আসাম রাইফেলসের একটি ইউনিট নাগাল্যান্ডের মোন জেলায় নিরপরাধ ১২ গ্রামবাসী ও এক জওয়ানকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এটা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ভারতের সরকারি নীতি ও এর বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্যকে প্রতিফলিত করে। 

আমি মণিপুর এবং ত্রিপুরায় একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থার কেউ কোনো গুরুতর অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না: তারা রাজ্য সরকারের কাছে দায়বদ্ধ নয়। এভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা যখন-তখন ধর্ষণ এবং খুনে লিপ্ত হয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশের প্রতিরোধ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। শুধু কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোই তা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

আফস্পা আসলেই একটি ‘সত্যিকারের নোংরা ও ভয়ংকর আইন’। ২০০৪ সালে মণিপুরে ঘটা এক ঘটনায় এই আইনের বিষয়টি ভালোভাবে প্রকাশ্যে আসে। ওই বছর থাংজাম মনোরমা নামের এক তরুণীকে আসাম রাইফেলসের সদস্যরা প্রথমে গ্রেপ্তার এবং পরে হত্যা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, মনোরমা একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য ছিলেন এবং এমন একটি অপরাধ করেছিলেন, যা শুধু একটি কেন্দ্রীয় সংস্থাই মোকাবিলা করতে পারে। মনোরমাকে গভীর রাতে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করা হয়। যদিও আসাম রাইফেলস ও আফস্পা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে’, কিন্তু তাদের ‘অপারেশনাল কন্ট্রোল’ কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে। মনোরমা হত্যার প্রতিবাদে রাজ্যের রাজধানীতে আসাম রাইফেলসের সদর দপ্তরের সামনে একদল নারী পোশাক খুলে বিক্ষোভ করেছিলেন। তাঁরা দাবি করছিলেন যে তাঁদেরও মনোরমার মতো ধর্ষণ ও হত্যা করা হোক।

২০০০ সালে মণিপুরে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে। আসাম রাইফেলসের সদস্যরা বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা একদল নিরপরাধ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনার পর শর্মিলা চানু নামের এক তরুণী আফস্পা বাতিলের দাবিতে অনশন শুরু করেন। যা-ই হোক, সেনা কর্তৃপক্ষ অনড় ছিল যে যত দিন মণিপুরে বিদ্রোহ চলবে, তত দিন আফস্পা বহাল থাকবে। শর্মিলা ১৬ বছর পর অনশন ভাঙেন। কিন্তু আফস্পা এখনো বহাল রয়েছে।

২০১৯ সালে নিরপরাধ দুই নাগরিক—সঞ্জিত এবং রবিনা নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে রাজ্য পুলিশ ও আসাম রাইফেলসের সদস্যরা ‘আফস্পা’র সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে একটি ব্যস্ত বাজারে গুলি করে হত্যা করে।

নব্বইয়ের দশক থেকে ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটসসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আফস্পাকে একটি অন্যায্য আইন হিসেবে রদ করার জন্য ভারত সরকারের কাছে আবেদন করে। কিন্তু ভারত সরকার এই আইনের সপক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরে তা বলবৎ রাখে। 

ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অনেক আইনের মধ্যে আফস্পা হলো একটি। এসব নিয়ে সুশীল সমাজে বহু আলোচনা হয়েছে। জীবন রেড্ডি কমিটি (২০০৫) আফস্পা বাতিল করার কথা বিবেচনা করেছিল। শুধু বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আইনটিকে ২০০৪ সালে প্রণীত আরেকটি দমনমূলক আইনে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এই সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। সরকারের বক্তব্য, আসাম রাইফেলস উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান কেন্দ্রীয় সংস্থা। বলা হয়, আফস্পা উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি অতিপ্রয়োজনীয় আইন। কিন্তু আইনটি বিদ্রোহ দমনের নামে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর একটি বিশাল মানসিক বোঝা চাপিয়েছে। অথচ বিদ্রোহ দমনের সহজ সমাধান হচ্ছে বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে বসে কথা বলা এবং তাদের সমস্যার কথা শোনা।

আগেই বলা হয়েছে, জীবন রেড্ডি কমিটি আফস্পার মৌলিক বিধানগুলো ২০০৪ সালে প্রণীত আনলফুল অ্যাকটিভিটিস (প্রিভেনশন) আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল, যাতে এটি কম বৈষম্যমূলক দেখা যায়। কমিটির সুপারিশ গৃহীত হয়নি, সম্ভবত সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতার কারণে। 

আফস্পার অস্তিত্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় রাজ্য পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাকে ক্ষুণ্ন করে চলেছে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ভিপি মালিক, যিনি মণিপুরে বিদ্রোহবিরোধী অভিযানে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি ২০০৪ সালে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘হয় আফস্পা থাকবে আর নয়তো বিদ্রোহবিরোধী অভিযান নয়।’ এই ইস্যুতে সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান কেন্দ্রকে জীবন রেড্ডি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে বাধা দেয়। ইরম শর্মিলার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ অনশন বা আসাম রাইফেলস সদর দপ্তরের সামনে মণিপুরের সাহসী নারীদের প্রতিবাদ ভারত সরকারকে মণিপুর থেকে আফস্পা অপসারণ করতে রাজি করার মতো শক্তিশালী ছিল না। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা এমনই।

মণিপুরে বিশেষ ক্ষমতা আইন আফস্পা থাকার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান সুবিধাভোগীদের মধ্যে একটি ছিল রাজ্যের পুলিশ বাহিনী, যা আফস্পার অধীনে জবাবদিহি না থাকার ফলে বহু বীরত্বসূচক পদক পেয়ে গেছে।

উত্তর-পূর্বে আফস্পা একটি বড় ট্র্যাজেডি। এদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, যার অধীনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও আসাম রাইফেলস এবং যারা আফস্পার কাজের জন্য দায়ী, উত্তর-পূর্বে ‘আইনশৃঙ্খলা’ পরিচালনার জন্য বার্ষিক বিশাল তহবিল সরবরাহ করে চলেছে। 

কে এস সুব্রামানিয়ান, ত্রিপুরা সরকারের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা
(দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনে প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক ও কলাম লেখক রোকেয়া রহমান

সৌজন্যে- আজকের পত্রিকা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top