‘‌একটা গোষ্ঠী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়েও বেশি লুট করছে’

বদরুদ্দীন উমর

দেশের মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বদরুদ্দীন উমরের অবস্থান সামনের সারিতে। পিতা আবুল হাশিম ছিলেন উপমহাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা। পারিবারিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী বদরুদ্দীন উমর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৫৩ বছর ধরে। দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে শতাধিক বই লিখেছেন। দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন

দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই।

দেশের সব ব্যাংক এখন পরিচালিত হচ্ছে সুবিধাভোগী লোকজনের দ্বারা। ডজন ডজন ব্যাংক এসেছে, যা জনগণের সম্পদ লুটপাটের বন্দোবস্ত। লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকগুলো থেকে তছরুপ হয়েছে। দিন কয়েক আগেই খবরের কাগজে বেরিয়েছে, এস আলম বলে যে গ্রুপ আছে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন দেশে কোম্পানি তৈরি করেছে এবং সম্পদ গড়েছে। এছাড়া গার্মেন্ট মালিকদের মধ্যে ৯০ শতাংশই বিদেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্পদ গড়েছে। ওয়াসার এমডিকে সাতবারের মতো নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার নানা অনিয়ম নিয়ে রিপোর্টও এসেছে। তাকে সরিয়ে না দিয়ে তাকে যে সমালোচনা করেছিল বোর্ডের সেই চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কাজ যারা করছে, তাদের সঙ্গে এমডি ও সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে। এ কথা কে অস্বীকার করতে পারবে? কাজেই এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দলের সম্পর্ক হয়েছে। 

এখানে বর্তমানে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যে ব্যবসায়ী বা শিল্প মালিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক লোকেরাও অর্থ আত্মসাৎ করছে, পাচার করছে। পাচারকৃত সে টাকা বিদেশে জমা হচ্ছে। তাদের পাচারের ধরন এমন যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে আঠারো ও উনিশ শতকে যে লুট হয়েছিল সেটির সঙ্গে এটি তুলনীয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতি সেই লুটের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ একটা খুব উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো ইংরেজ লুটপাটকারীরা বিদেশের টাকা লুটপাট করে তাদের নিজ দেশে পাঠাত। আর এখনকার এ বাংলাদেশী লুটপাটকারীরা নিজ দেশে লুটপাট করে বিদেশে পাঠাচ্ছে। কাজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। যে সাম্রাজ্যবাদীদের আমরা দোষারোপ করি, তাদের চেয়েও এরা দেশের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। 

এখানে মেগা প্রজেক্ট মানে মেগা তছরুপ। মেগা প্রজেক্টের জন্য যে ধার করা হয়েছে, এ ঋণ এখন উত্তরোত্তর বেশি শোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যদি চলেও যায় এ মেগা প্রজেক্টের ধকল পরে যারা আসবে, তাদের ওপর দিয়ে যাবে। একদিকে মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে অন্যদিকে দেশের মানুষের চিকিৎসা নেই, শিক্ষা নেই। দেশের ব্যবসায়ীসহ অন্যরা লুটপাট করছে। এ লুটপাটের বড় রকম অংশীদার যারা ক্ষমতায় রয়েছে তারা। এ ধরনের হাজার হাজার লোক লুটপাট করে বিদেশে সম্পত্তি বানাচ্ছে। 

স্বাধীনতার আগে নির্বাচনগুলোয় সব পক্ষকেই ফলাফল মেনে নিতে দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে সংকট কাটছে না কেন?

আইয়ুব খান যখন সামরিক অভ্যুত্থান করেছিল তখন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনীতিবিদরা নিজেদের মধ্যে কোন্দলের কারণে নিন্দিত হয়েছিল। সেই কোন্দলের জেরে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্টও সরকার গঠন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ও ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির বিবাদের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে যারা ১৯৫৪ সালে তাদের ভোট দিয়েছিল, তারাও বিপক্ষে চলে গেল। রাজনীতিবিদদের এ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতায় এলেন। 

ইয়াহিয়া খানের সময় অবস্থা অন্য রকম ছিল। ’৬৯ সালের বিশাল গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসে ইয়াহিয়া। তখন ইয়াহিয়ার তো রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বলার মতো কিছু ছিল না। সে সময় বড় গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে। কাজেই এসবের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে নির্বাচন দিতে হয়েছিল। তখন দেশের যে অবস্থা ছিল তাতে নির্বাচনে কারচুপি করার বিশেষ অবস্থা ছিল না। 

আরেকটা বিষয় হলো যা কিছুই হোক, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশীদের ভয় করত। কিন্তু বাংলাদেশীরা তো নির্ভয়। কারণ তারা মনে করছে দেশ তাদের, তারা দেশের মালিক, যা ইচ্ছে তা-ই করবে। পাকিস্তানিরা তো বিদেশীর মতো ছিল। কাজেই এরা এখানে এসে যে জুলুম করেছে, সেটি নিয়ে তাদের মধ্যে ভয় ছিল। আইয়ুব খানও যে নির্বাচন করেছে, তাতেও কারচুপির কোনো অভিযোগ ছিল না। নির্বাচনের ব্যবস্থাকে সে এক রকম তৈরি করেছিল, কিন্তু নির্বাচনে কোনো রকম দমন-পীড়নের সাহস করেনি। 

আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পাদনে নির্বাচন কমিশন কতটুকু সক্ষম?

নির্বাচন কমিশন এখানে অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার। এখন নির্বাচন কমিশন মানে ক্ষমতাসীনদের একটি অঙ্গ। তাই নির্বাচন কমিশনের আলাদা কোনো স্বতন্ত্র ভূমিকার কথা চিন্তা করা যায় না। ভারতে যেমন সাংবিধানিক একটা ব্যবস্থা আছে, সাংবিধানিকভাবে তা কাজ করে। এখানে তো স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনো উপায় নেই। নির্বাচন কমিশন গাইবান্ধায় একটা নির্বাচন খারিজ করল। তাই ক্ষমতাসীনরা মনে করল তাদের অধীন হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনার কিছু নড়াচড়া করছে। এটা বন্ধ করতে তারা আবার আইন করেছে যে নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচন বন্ধ করতে পারবে না। বাতিল ঘোষণা করতে পারবে না। এটা তো আশ্চর্যজনক বিষয়! নির্বাচন কমিশন এখানে যে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার, সরকারি সিদ্ধান্তই যে সার্বভৌম, তা-ই এসবের দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচন কমিশন বাতিলের জন্য বলছে। আসলেই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে এমন নির্বাচন কমিশন ও কমিশনার থাকতে হবে, যারা কোনো দলের প্রতিনিধি নয় বা যারা কোনো দলের হুকুম তামিল করে না। কাজেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে এ নির্বাচন কমিশনকে বাতিল করতে হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন করতে হবে। 

বিএনপির আন্দোলন কি দলটির দাবি আদায়ের জন্য যথেষ্ট?

বিএনপি যেটা করছে, লাখ লাখ লোক নিয়ে তারা বড় বড় সমাবেশ ও মিছিল করছে। সারা দেশ ও ঢাকাজুড়ে করছে এবং বলছে যে এ সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব না। শুধু এটা দিয়ে আওয়ামী লীগকে সরানো যাবে না। আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচন করে আর বিএনপি এতে না যায় তাহলে আওয়ামী লীগেরই সুবিধা হবে। তারপর যেটা হচ্ছে যে শুধু মিটিং-মিছিল করে কিছুই করা যায় না। এভাবে সরকারকে আসলে ধাক্কা দেয়া যায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে, এর অর্থ হলো অন্য সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আর নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সমস্ত জনগণের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সেই নির্বাচন বন্ধ করা। যদি দেখা যায়, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে না, প্রতিনিধিত্বমূলক হচ্ছে না, জনগণের কোনো ব্যাপার এর সঙ্গে থাকছে না তাহলেই তো জনগণের একটা নৈতিক দায়িত্ব ও অধিকার হয় এ নির্বাচন বন্ধ করার জন্য। নির্বাচন বয়কটের কথা বললে আওয়ামী লীগের সুবিধা হয়। তাই বলতে হবে নির্বাচন হতে দেয়া যাবে না। নির্বাচন আমরা বন্ধ করব, নির্বাচন কেন্দ্রগুলো আমরা ঘেরাও করব, কেউ ভোট দিতে যাবে না। পাকিস্তানেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আছে। দু-তিনদিনের মধ্যে তাদের মন্ত্রিসভা ডিজলভ করে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। পাকিস্তানের মতো দেশেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে বলছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেব না। 

বিএনপি নির্বাচন হতে দেব না বললে কি রাজনীতিটা সংঘর্ষময় হয়ে উঠবে না?

সংঘর্ষ হতেই পারে। যখন কোনো বিরাট গণআন্দোলন হয় তখন সংঘর্ষ হয়। অহিংস কিংবা একেবারে নিরামিষ ব্যাপার তো হতে পারে না। জনগণের সঙ্গে যখন ক্ষমতাসীনদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয় সেখানে দ্বন্দ্ব থেকে সংঘর্ষে যায়। এখন যদি কেউ মনেও করে যে আমি কোনো সংঘর্ষ করব না, সেখানে পরিস্থিতি এমন হতেই পারে যে সেখানে সংঘর্ষ হবে। সংঘর্ষ হতেই পারে। এটাকে ভয় করলে চলবে না। একটা অভ্যুত্থান মানেই সংঘর্ষ। সেটি কোনো টি পার্টি না। 

বিএনপির চলমান আন্দোলনের সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনের পার্থক্য বা মিল কোথায়?

এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। সারা দেশের বেসামরিক দলগুলো আন্দোলনে অংশ নেয়। তখন সামরিক আর বেসামরিক একটি ব্যাপার ছিল। এখনকার আন্দোলনে সামরিক বাহিনী তো চুপচাপ বসে আছে। তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা এখানে নেই। এখানে দুই বেসামরিক অংশের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। এরশাদের আমলের সঙ্গে এটার তফাত হলো এরশাদের আমলে যেভাবে বিরোধীদের দমন করা হয়েছিল যতটুকু নির্যাতন হয়েছিল এর চেয়ে বেশি এখন হচ্ছে। 

আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোনদিকে যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে যাবে তা অনিশ্চিত। মোটামুটি বলা যায়, এটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে। আমার মনে হয় এখন যেভাবে দমন নীতি চালানো হচ্ছে সেটি এভাবে আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না এবং এতে সরকারের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আবার বিএনপি যে ফেরেশতা, তা-ও নয়। জনগণ মূলত বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সরাতে বদ্ধপরিকর। এ কারণে জনগণ এখন বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছে। নির্বাচন হলে তারা বিএনপিকেই ভোট দেবে। 

রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধির ব্যবহার কীভাবে করতে হবে সেটি খুব ভালো করেই জানে। কী করে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে হবে, কী করে চাকরির সুবিধা হবে, কী করে প্রমোশন হবে, কী করে বিদেশে যাওয়া যাবে—এই হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা। বুদ্ধি দিয়ে বিদ্যাচর্চা বা গবেষণায় তাদের বুদ্ধির ব্যবহার নেই বিশেষ।

ব্রিটিশ আমলে কিংবা পাকিস্তান আমলে বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে সোচ্চার ছিল এখন তাদের কোনো কণ্ঠ শোনা যায় না। তাদের কোনো আওয়াজ নেই। তারা শুধু নিজেদের চাকরি ও বেতন বৃদ্ধি নিয়ে থাকে। তাই এতে যে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সেখানে তাদের মধ্যে কোনো আন্দোলন নেই। মাঝে মাঝে হয়তো দু-একটা বিবৃতি দেয়। এর চেয়ে বেশি ভূমিকা তাদের নেই। 

এখানে আগে বুদ্ধিজীবীদের জনগণের সঙ্গে যে একটা সম্পৃক্ততা থাকত কবি হোক বা লেখক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার বা প্রবন্ধকার হোক। এখন সবাই এসব কাজ করে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি তিনজন শিক্ষকে একজন অধ্যাপক। এ নিয়ে আপনি কী বলবেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মাত্র একজনই অধ্যাপক হয়েছিলেন। তিনি হলের রমেশচন্দ্র মজুমদার (আর সি মজুমদার)। এমনকি সত্যেন বোস, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সবাই রিডার ছিলেন। রিডারও ছিল অল্পসংখ্যক। তখন এত বিদ্যা নিয়েও অধ্যাপক হয়নি। এখন অধ্যাপক হওয়ার জন্য বিদ্যার প্রয়োজন হয় না, বয়স হিসেবে হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের যেভাবে বয়স হিসাব হয়। তাছাড়া অনেক রকম দুর্নীতি করে উচ্চপর্যায়ের লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে পদোন্নতি নিয়ে অধ্যাপক হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ৫২ বছরের রাজনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

গত বায়ান্ন বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে কাদের হাতে ক্ষমতা। প্রথমেই দেখতে হবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কারা ক্ষমতায় এল। যাদের হাতে ক্ষমতা তারাই রাজনীতির মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দল আওয়ামী লীগ একটি অনুৎপাদনশীল শ্রেণীর একটি অংশের দ্বারা গঠিত। উকিল, মোক্তার, স্কুলশিক্ষক, দোকানদার, বেকার যুবক, ছাত্র এসবই ছিল আওয়ামী লীগের লোকজন। বড় জমির মালিক, বড় শিল্প-কারখানার মালিক এরা সবাই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে জড়িত ছিল। এই যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দল আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে ক্ষমতায় এল। এরা ’৭০ সালেও মনে করেনি যে এভাবে ক্ষমতায় আসবে, স্বাধীন হয়ে যাবে। ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেল যেহেতু এরা কোনো উৎপাদনশীল অংশের কোনো প্রতিনিধিত্ব করত না, তাই ক্ষমতা পাওয়ার পরই যে জিনিসটা হয়ে থাকে; এরা নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়াতে দাঁড়াল। এখন উৎপাদনশীল অংশ হলে তারা উৎপাদনের মাধ্যমে ধন-সম্পদ অর্জন করত। যেমন পাকিস্তানিরা করেছিল, যেটা ইউরোপে হয়েছিল বুর্জোয়া বিকাশের সময়। এখানে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকায় তাদের ধন-সম্পত্তি অর্জনের উপায় দাঁড়াল বিদ্যমান সম্পদ লুণ্ঠন করা। সরকারি সম্পত্তি, অবাঙালি-বিহারিদের সম্পত্তি বা যেসব অবাংলাদেশী আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল না তাদের সম্পত্তি। অর্থাৎ যত রকম লুটপাটের উপায় ছিল, সব দিয়ে লুটপাট করা হয়েছিল। লুটপাট করে সমাজতন্ত্রের নামে এখানে শিল্প-কারখানা করার উপায় ছিল না অথচ ওদের হাতে কোটি কোটি টাকা জমছে। টাকা জমলেই যেটা হয় পুঁজি তার মুনাফার দিকে যেতে থাকে। মুনাফার জন্য যেতে গেলে ব্যবসাও আইনগতভাবে চলবে না, কারণ সীমাবদ্ধতা আছে। সেজন্য এ টাকা বিনিয়োগ হতে লাগল চোরাকারবারে। এটা হলো অভ্যন্তরীণ ব্যবসা। অন্যদিকে চোরাচালান হলো বৈদেশিক ব্যবসা। এই করেই এখানকার মধ্যশ্রেণী বা শাসকশ্রেণী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এভাবেই গঠিত হলো। 

বিগত ৫০ বছরের রাজনীতির মূল নিয়ামক শক্তিই এই ব্যবসায়ী বুর্জোয়ারা। যেজন্য ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে দেখা যাবে যে এখানে কমসংখ্যক ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে ছিল। কারণ তখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা সংগঠিত হতে পারেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা সংগঠিত হতে থাকল, সবকিছু কবজা করতে থাকল। সেজন্য এখন দেখা যাবে যে জাতীয় সংসদের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী। বাকিরা ব্যবসায়ী না হলেও কোনো না কোনোভাবে ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্কিত। 

অন্যদিকে কমিউনিস্টরা ১৯৭১ সালে নানা ভুলভ্রান্তি করে নিজেদের সাংগঠনিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পিকিংপন্থী ও মস্কোপন্থী থেকে তারা নিজের পায়ে আর দাঁড়াতে পারল না। এই ৫০ বছরের রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের ভূমিকা খুবই সামান্য। দেখা যাবে ব্রিটিশ আমলে কিংবা পাকিস্তানি আমলেও এখানে কমিউনিস্টদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা রাজনীতিতে ছিল। যদিও তারা প্রধান বিরোধী দল ছিল না। 

স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্রদের অরাজনীতিকীকরণ। আগে ব্রিটিশ আমলে কিংবা পাকিস্তান আমলে ছাত্রদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৫৪ সাল থেকে ’৬২, ’৬৬ কিংবা ’৬৯ সালের আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু দেখা যাবে ’৭২ সালের পরে ছাত্রদের আর ভূমিকা নেই। সত্তরের দশকটা এদিক দিয়ে একটা অন্ধকারের যুগ। আশির দশকে যে ছাত্ররাজনীতি শুরু হলো তার মধ্যে গণতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল কিছুই নেই। ছাত্ররাজনীতি ’৮০ সাল থেকেই অবনতি হতে শুরু হলো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে এরশাদের পতনের পর ’৯০ সাল থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আমলে প্রথমবারের মতো দেখা গেল যে ছাত্ররা আর সেই আগেকার দিনের ছাত্র নেই। এর গুণ্ডাতন্ত্র ও নানা রকম নির্মাণে ভাগ বসানো শুরু করল। তার মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিষয়ে ছাত্ররা জড়িত হয়ে পড়ল। এসব জিনিস আগে চিন্তা করা যেতে না। তারা নানা রকম দুর্নীতি করে একটা গুণ্ডা বাহিনীতে পরিণত হলো। ’৯১ সাল থেকেই এটা শুরু হলো। আগে ছাত্রসমাজের প্রতি মানুষের একটা সহানুভূতি ছিল, তাদের ভালোবাসত। এখন ছাত্রদের মানুষ আর ভালোবাসে না। আমাদের মতো অনুন্নত দেশে ছাত্ররাজনীতির যে গুরুত্ব থেকেছিল বা থাকে সেটি এখন নেই। 

স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের প্রথম সাড়ে তিন বছরে বিরোধীদের দমন করে শেষ করা হয়েছিল। ’৭৫ সালে দেখা যাবে বেশির ভাগ খবরের কাগজ বন্ধ করে দেয়া হলো, সমস্ত দল নিষিদ্ধ করা হলো। যত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল তা নিষিদ্ধ করা হলো। এরশাদ-পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবক্ষয় হয়েছে। এরশাদের সময় যেমন ছিল সংসদীয় ব্যবস্থায় তা ক্রমাগত বেড়েছে। আর এখন পুরোপুরি একটা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা চলছে। এখানে জনগণের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। নির্বাচন প্রায় উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধিত্ব বলে কিছু নেই। যেমন ভারতেও সরকার নানা রকম দমন-পীড়ন করছে। কিন্তু একটা দিক হলো ভারতের নির্বাচনটা এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ হয়। সেখানে যে নির্বাচন হয় সেখানে বিরোধী দল বলতে পারে না সরকার কারচুপি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়াটাকে সম্পূর্ণ শেষ করে দেয়া হয়েছে। তাহলে একটা দেশে যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে দেয়া হয় তখন সাধারণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ আর থাকে না।

সৌজন্যে- বণিক বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top