ওপেনহাইমারের অনুশোচনা এবং হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ

মঞ্জুরে খোদা

হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার দিন এগিয়ে আসার সময়েই হলিউড বাজারে ছাড়ল ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমাটি। এই ছবির যেমন অনেকে প্রশংসা করেছেন; সমালোচনাও কম হয়নি।

সেখানে দেখানো হয়েছে, ৬ আগস্ট হিরোশিমায় বোমা হামলার তিন দিন পর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে বোমা হামলা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য হচ্ছে, প্রথম আক্রমণের পরও জাপানিরা বুঝতে পারেনি– পারমাণবিক শক্তির ভয়াবহতা কতটা মারাত্মক। এ কারণে তারা আত্মসমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তখন তাদের ওপর দ্বিতীয়বার বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এর পর তারা হার মানতে বাধ্য হয় ও আত্মসমর্পণ করে।

বোমা হামলার পরই রবার্ট ওপেনহাইমার রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। পুরো আমেরিকার মানুষ তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেন, এমন একটা জিনিস তিনি তৈরি করেছেন, যা পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাঁর তৈরি বোমা ইতোমধ্যে কেড়ে নিয়েছে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ। যেখান থেকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউ বাদ যায়নি। এ নিয়ে তিনি মানসিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন ও কষ্ট অনুভব করেন।

তিনি ভাবতে থাকেন, তিনি কি তাহলে পৃথিবীর মানুষের কাছে আজীবন একজন খুনির পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তিনি তাঁর এই অনুশোচনা শেয়ার করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ হামলাকে সফলতার চোখেই দেখেন। তাঁর মনোভাব গ্রহণ না করে শাসক দৃঢ়কণ্ঠে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

ছবিটির সবচেয়ে হতাশার দিকটি হচ্ছে, জাপানে বোমা হামলার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ের আলাপ অনুপস্থিত। আণবিক বোমা নিক্ষেপের মতো বিশাল একটি সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন কীভাবে নিল; সেখানে মিত্রবাহিনীর অবস্থান, তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া কী হয়েছিল; তার কিছুই আসেনি। এমনকি বোমা হামলার কোনো দৃশ্যও সেখানে দেখানো হয়নি। কেন দেখানো হয়নি? সে প্রশ্ন তোলা কি অমূলক?

‘রাজনীতির অন্ধকার দিককার উচ্চাভিলাষী ও লালসাপূর্ণ মানুষরাই এমন বিধ্বংসী সিদ্ধান্তের জন্য মূলত দায়ী’– এ কথা কে না জানে! এ সত্যকে পাশ কাটিয়ে হিরোশিমায় বোমা হামলার বয়ান তৈরি হবে মার্কিন দায়মুক্তির অপচেষ্টা বৈ কিছু নয়।

পারমাণবিক বোমা হামলা ও তৎপরবর্তী ভয়াবহতার দৃশ্য বাদ দিয়ে ব্যক্তি ওপেনহাইমারের আক্ষেপ, অনুতাপ ও মানসিক জটিলতার দিকটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও লাখো মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ, প্রকৃতি ও যুগ যুগের মানসিক ক্ষতির দায় কে নেবে? হলিউড ইতিহাস ও রাজনীতিবিষয়ক অনেক চলচ্চিত্রকে তাদের ঐতিহাসিক দায়মুক্তির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। মনে হয়েছে, ওপেনহাইমারও তার বাইরে নয়। এখানে ওপেনহাইমার মুখ্য নন। এতে তুলে ধরা হয়েছে একটি ঐতিহাসিক বিষয়কে। ব্যক্তি ওপেনহাইমারকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নোলান সফল হলেও হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমা হামলার প্রকৃত চিত্র ও সত্যকে তিনি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

২.

জাপানের হিরোশিমায় যে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সেই বোমাটির নাম ছিল ‘লিটল বয়’; অর্থাৎ খুদে বালক। এই বোমা বহনকারী বিমানের চালক ও নিক্ষেপকারী ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পল টিবেটস। হিরোশিমা ধ্বংসযজ্ঞের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বয়োবৃদ্ধ বৈমানিক বলেছিলেন, ‘লোকজন কী বলছে না বলছে তাতে আমি বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করি না। লাখ লাখ মানুষের জীবন আমরা রক্ষা করতে পেরেছি। ওই ঐতিহাসিক মিশনে যাত্রা করার সময় আমি ভালোভাবেই অবগত ছিলাম– কী ঘটতে যাচ্ছে। এতে আমি বরং আনন্দই পেয়েছিলাম। আজ এত বছর পর ওই ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করে এক ধরনের সুখের অনুভূতি আমি পেয়ে থাকি।’

হিরোশিমায় বোমা হামলার দিনটি ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল ও নির্মল। শহরের কেন্দ্রস্থলের ৫৮০ মিটার উঁচুতে এ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের মধ্যেই তাপমাত্রা কয়েক লাখ ডিগ্রিতে পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিঝঞ্ঝা, কালো বৃষ্টি ও তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পরে সর্বত্র। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে বোমা হামলায় তাৎক্ষণিক নিহত হয়েছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ১৫০ জন এবং পরবর্তী সময়ে উভয় শহরে তেজস্ক্রিয়তায় নিহত হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। মুহূর্তেই দুটি জনপদ মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না করে কেন দুটি সাধারণ লোকালয়কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হলো?

আক্রমণকারীদের বক্তব্য, এ হামলার ধ্বংসক্ষমতায় ভীত হয়ে জাপানিরা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে আণবিক বোমা হামলাকে অনেক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটা শুধু জাপানকে আঘাত করার বিষয় ছিল না। নেপথ্যের কারণ ছিল, প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নকে হুমকিতে রাখা এবং বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব যাতে বজায় থাকে।

হিরোশিমায় যখন হামলা করা হয় তখন ছিল যুদ্ধের শেষ সময়। মে মাসে জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে ইউরোপে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। জাপানও অবস্থা বেগতিক ও নিশ্চিত পরাজয় জেনে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় একটা আত্মসমর্পণের উপায় খুঁজছিল। কিন্তু সে সুযোগ তারা পায়নি বা দেওয়া হয়নি।

পারমাণবিক বোমা হামলার পর বিশ্বে শান্তির পক্ষে যে জনমত গড়ে উঠেছিল, তাকে অবজ্ঞা করে পরাশক্তিগুলো সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে। এর প্রমাণ গত ৭০ বছরে সামরিক ব্যয় দাঁড়ায়েছে বহু গুণ। পারমাণবিক বোমার আতঙ্ক কমেনি। বোমা হামলাকারীদের দম্ভ, উচ্ছ্বাস আজও তেমনি আছে।

এ বোমা তৈরি ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ১৫০ জনের অধিক বিজ্ঞানী তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যানের কাছে আবেদন করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ না করে। পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জাপানকে যেন এই বোমার ক্ষয়ক্ষতির পরিধি-ব্যাপকতা, ধ্বংস ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এতে জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই আণবিক বোমার গোপন সফল বিস্ফোরণের পরদিন বিজ্ঞানীরা শাসককে এর নৈতিক দায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু ট্রুম্যান তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। শুধু তাই নয়; হিরোশিমায় বোমা আক্রমণের ৪২ দিন আগে বিশ্বকে রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল জাতিসংঘে। কিন্তু মার্কিনিরা তাদের সেই অঙ্গীকারও রক্ষা করেনি।

হিরোশিমার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে আজও একমাত্র বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েও কয়েকটি হাড় নিয়ে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সভ্যতা-মানবতা ধ্বংসের কালের সাক্ষী এই ভবনকে আইনি জটিলতার কথা বলে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা’য় আজও স্থান দেওয়া হয়নি। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমা হামলার প্রায় ৮ দশক পরও মার্কিনিরা কোনো অনুশোচনা করেনি, ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। কিন্তু কেন?

২০২২-এ স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সামরিক ব্যয় গত বছরের চেয়ে অন্তত ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক নান তিয়ান ডিডব্লিউকে বলেন, ‘সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় শুধু বেশিই নয়, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।’ যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বে সামরিক খাতে সর্বাধিক ব্যয় করে; ৮৭৭ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীন ব্যয় করেছে ২৯২ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক খরচের ১৩ শতাংশ। সামরিক ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পল টিবেটস যে বিমানটি নিয়ে হিরোশিমা শহরের ওপর বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন, তিনি সেই বিমানের নাম রেখেছিলেন ‘এনোলা গে’। এনোলা গে হচ্ছেন পল টিবেটসের মা। পল তাঁর মায়ের নাম ব্যবহার করেই এই মানবতাবিরোধী জঘন্য কাজটি করেছেন। মা-ও তাঁর সন্তানের এই খুনযজ্ঞে এতটুকু বিচলিত হননি! বিশ্বের শাসকরাও আজ পেয়েছেন এনোলা গে’র চরিত্র। কখনও মানবতার নামে, কখনও গণতন্ত্রের নামে, কখনও শান্তির নামে মানবতাকে ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছেন তারা। তাদের এই শান্তির বাণী প্রহসন ছাড়া আর কী?

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সৌজন্যে- সমকাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top