ঔষধ প্রশাসন কি জনস্বার্থ সংরক্ষণে সক্ষম

এম শামসুল আলম

গত ৫ জানুয়ারি কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণ বিষয়ক ২০ জুলাই ২০২২ ও ৪ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখের প্রজ্ঞাপন দুটি বাতিল এবং ওষুধে লুণ্ঠনমূলক মুনাফা প্রতিরোধের জন্য (ক) চেয়ারম্যান, প্রতিযোগিতা কমিশন, (খ) সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, (গ) মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, (ঘ) মহাপরিচালক, বিএসটিআই এবং (ঙ) মহাপরিচালক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে এক পত্র দেয়।

ক্যাবের পত্রে (ক) ওষুধের মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন দুটি বাতিল করা, (খ) বিধি মতে প্রণীত পদ্ধতিতে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করা, (গ) ওষুধে লুণ্ঠনমূলক (প্রিডেটরি) মুনাফা প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, (ঘ) অনিবন্ধিত ওষুধ বিক্রির প্রতিকার ও প্রতিরোধ নিশ্চিত করা এবং (ঙ) পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আমদানীকৃত ভ্যাকসিন/ওষুধ বিক্রির দায়ে সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়।

ক্যাবের পত্রের সূত্রে প্রতিযোগিতা কমিশন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে এক পত্র দেয়। সেই পত্রের সূত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ গত ৩০ মার্চ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে পত্র দেয়। তাতে ক্যাব কর্তৃক উপস্থাপিত বিষয়গুলো ক্যাবের প্রতিনিধিসহ প্রয়োজনে অংশীজনদের নিয়ে সভা করে জরুরি ভিত্তিতে সভার সিদ্ধান্ত/সুপারিশ স্বাস্থ্য বিভাগকে জানাতে বলা হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১৩ এপ্রিল এবং পুলিশের এসবির ১০ এপ্রিলের পত্র দুটির সূত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ১ মে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে আরো একটি পত্র দেয়। তাতে ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনে দুর্ভোগসংক্রান্ত পুলিশের এসবির প্রতিবেদনের আলোকে পরীক্ষান্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। এছাড়া প্রতিযোগিতা কমিশনের ২২.০২.২০২৩ তারিখের পত্রের সূত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধিসংক্রান্ত ২২.০২.২০২৩ ও ০৪.১২.২০২৩ তারিখে জারীকৃত প্রজ্ঞাপন দুটি বাতিলপূর্বক ক্যাবের স্ব-ব্যাখ্যাত আবেদনপত্রের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। 

১১ মে এক পত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ১৭ মে অধিদপ্তরের সভাকক্ষে মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে এক সভা আহ্বান করে। সভার আলোচ্য বিষয় ছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে করণীয় নির্ধারণ। সভায় ১৩ জনকে ডাকা হয়। অথচ উপস্থিত ছিলেন ২১ জন। তাদের মধ্যে নয়জনই ঔষধ শিল্পের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা। আবার এ নয়জনের তিনজনই হলেন ঔষধ শিল্প সমিতির। সমিতির সভাপতি তাদের মধ্যে অন্যতম। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে ছিলেন মহাপরিচালকসহ ছয়জন। মন্ত্রণালয় থেকে ছিলেন একজন অতিরিক্ত সচিব। এসবি থেকে ছিলেন দুজন কর্মকর্তা। একজন এনএসআই ও একজন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিও ছিলেন। ছিলেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক।

সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়: সভায় এসবির ১৭ দফা সুপারিশ উপস্থাপন হয়। কিন্তু সুপারিশের ব্যাপারে কোনো যুক্তিতর্ক আসেনি এবং বিচার-বিশ্লেষণও হয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু বলেছে, মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মকর্তারা জনসচেতনতামূলক সভায় ওষুধ আইনসহ হাতে কেটে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি না করার বিষয়ে সচেতন করেন। একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে ধ্বংসের জন্য পাঁয়তারা করছে—এমন মন্তব্য করে ঔষধ শিল্প সমিতির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। ওষুধের মূল্য চাইলেই বৃদ্ধি করা যায় না, কারণ বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি বাংলাদেশ সরকারের একজন এমপি—এমন মন্তব্য করেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। সভায় ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতির বক্তব্যই প্রাধান্য পায় এবং নিম্নে বর্ণিত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়: (১) ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, এপিআই, মেডিকেল ডিভাইস, লাইফ সেভিং ওষুধ আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদানের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট অথরিটিকে অবহিত করার ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করতে হবে। (২) ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হবে। (৩) বেশি দামে ওষুধ বিক্রয় প্রতিরোধের বা কোনো অভিযোগ পেলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। (৪) ঔষধ কোম্পানিগুলোর নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা (এগ্রেসিভ মার্কেটিং) পরিহার এবং বিজ্ঞাপন ও বিপণন ব্যয় হ্রাসের নিমিত্তে এথিক্যাল মার্কেটিং গাইডলাইনটি অনুসরণ করতে হবে। (৪) ওষুধের মূল্যসংক্রান্ত তথ্যাদি অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। (৫) বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প সমিতি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে নিয়মিত গণমাধ্যমের সঙ্গে সভা করতে হবে।

স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ (এসবি) ১৩ মে প্রদত্ত প্রতিবেদনে বর্ণিত ১৭ দফা সুপারিশ: (১) সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দানের নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে, (২) ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করা যেতে পারে, (৩) চাহিদা মতো ওষুধ উৎপাদন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি বৃদ্ধি করা যেতে পারে, (৪) যেসব ওষুধের চাহিদা বেশি সেগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি করে বাজারে ওষুধের সংকট দূর করা যেতে পারে, (৫) ফার্মেসিগুলো যেন বেআইনিভাবে মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি করা যেতে পারে, (৬) জাতীয় ওষুধ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, (৭) সরকার কর্তৃক অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্যনির্ধারণ ও নির্ধারণকৃত মূল্যের অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, (৮) জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলোর মূল্যের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, (৯) ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, ওষুধ ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন, বাজারজাত ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, (১০) ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত নির্দেশক মূল্যের বাইরে যেন কোনো কোম্পানি ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা যেতে পারে, (১১) বর্তমানে উৎপাদিত প্রায় দেড় হাজার জেনেরিকের সব ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক বা এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, (১২) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে, (১৩) দেশে ওষুধের মানসম্মত কাঁচামাল উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, (১৪) ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর এককভাবে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ রহিত করে সব অংশীজনের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক মূল্যনির্ধারণ করা যেতে পারে, (১৫) ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহার এবং বিজ্ঞাপন ও বিপণন ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, (১৬) ওষুধের আকর্ষণীয় মোড়ক তৈরিতে ব্যয় হ্রাস করে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা যেতে পারে, এবং (১৭) চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লেখার বিনিময়ে ওই কোম্পানির কাছ থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

ক্যাবের পত্রে বলা হয়, ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ধারা ১১(১) মতে ভোক্তা পর্যায়ে সব ওষুধের মূল্যনির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণের একক এখতিয়ার সরকারের। অধ্যাদেশের ১১(১) ধারার সঙ্গে বিষয়ে উল্লিখিত প্রজ্ঞাপন দুটিতে বর্ণিত ওষুধের পুনর্নির্ধারিত মূল্যে অসংগতির বিবরণাদি নিম্নরূপ:

(১) সব ওষুধ নয়, দেশে উৎপাদিত প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের মাত্র ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে সরকার। বেশির ভাগ কোম্পানি ১১৭টি ওষুধের মধ্যে মাত্র কয়েকটি উৎপাদন করে। যদিও উৎপাদনকারী কোম্পানির জন্য এসব ওষুধের কমপক্ষে ৬০টি উৎপাদন করা বাধ্যতামূলক।

(২) ১১৭টির বাইরে অন্য সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানি নিজেই। তাতে ১১(১) ধারা লঙ্ঘিত হয়।

(৩) ২০০০ সালের পর থেকে ওষুধের পুনর্নির্ধারিত কোনো মূল্য গেজেটে প্রকাশ না করেই কার্যকর করা হয়। ওই দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ওষুধের পুর্ননির্ধারিত মূল্যও গেজেটে প্রকাশ করা হয়নি। কার্যকর করা হয়েছে।

(৪) প্রথম প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয় ২০.৭.২০২২ তারিখে। ওই প্রজ্ঞাপনে পুনর্নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা হয়েছে ৩০.৬.২০২২ তারিখ থেকে। দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয় ৪.১২.২০২২ তারিখে। এ প্রজ্ঞাপনে পুনর্নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা হয়েছে ২০.১১.২০২২ তারিখ থেকে। অর্থাৎ ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেরাই আগেই এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি ও কার্যকর করে। সরকার নিজের নামে তা প্রকাশ ও প্রচার করে মাত্র। ওই প্রজ্ঞাপন দুটি তারই প্রমাণ। ওষুধের মূল্য সরকার আসলেই নির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণ করে না।

(৫) গত ছয় মাসে ওই ১১৭টি ওষুধের মূল্য ১৩-৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাদবাকি ওষুষের মূল্য কখন কত বৃদ্ধি করা হয়েছে, তার কোনো প্রজ্ঞাপন বা সে-সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরকারের কোনো দপ্তরে পাওয়া যায়নি।

(৬) ২০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত ওষুধের মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভায় উপস্থাপিত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে দেখা যায়, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মার্কআপ ফ্যাক্টর ৩.৪০ গুণ ধরে ওষুধের মূল্য নির্ধারিত হয়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি যতটা ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি করে, তার ৩.৪ গুণ বেশি মূল্যবৃদ্ধি করে মার্ক-আপ ফ্যাক্টর। এই মার্ক-আপ ফ্যাক্টর ৩.৪০ নির্ধারণের কোনো আইনি ভিত্তি সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি। 

(৭) দামের এমন তারতম্যের কারণ হিসেবে বলা হয়, ছোট-বড় কোম্পানিভেদে ওষুধের মানে কোনো তারতম্য নেই। বড় কোম্পানিগুলো বিপণনে চিকিৎসকদের পেছনে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে। ফলে ওষুধের বাজার অলিগোপলির শিকার হয়।

(৮) ঔষধ প্রশাসন ও খাতসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনায় ১০টি কমিটি বিদ্যমান। সেসব কমিটিতে ওষুধ উৎপাদক কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। ফলে যথেচ্ছভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল আমদানিসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির পুরোটাই ওষুধ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ ওষুধের বাজার ও কাঁচামাল আমদানি শতভাগ অলিগোপলির শিকার।

(৯) অধ্যাদেশের ১১ ধারা অনুযায়ী ওষুধের মূল্যনির্ধারণ বিধি দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারকেই করতে হবে। অধ্যাদেশের ২৫ ধারায় বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের। অধ্যাদেশে নীতিমালা প্রণয়নের কোনো বিধান নেই। অথচ বিধি নয়, নীতিমালার আওতায় নির্বাহী আদেশে ওষুধের মূল্যনির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণ করা হয়। 

(১০) ওষুধের মূল্যনির্ধারণ কমিটি গঠনের কোনো বিধান অধ্যাদেশে নেই। বিধিতে থাকবে, অথচ বিধি প্রণয়ন না করে মন্ত্রণালয় সচিবের সভাপতিত্বে ওই কমিটিগুলো গঠন করে।

উল্লিখিত সংগতিগুলোর কারণে বিষয়ে বর্ণিত প্রজ্ঞাপন দুটি বেআইনি ও এখতিয়ারবহির্ভূত ও বাতিলযোগ্য। 

ক্যাবের আবেদনপত্রে আরো বলা হয়েছে, ‘বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ওষুধে লুণ্ঠনমূলক (প্রিডেটরি) মুনাফা হয়। যেমন (১) স্ক্য়ারের সালপ্রেক্স ২০ + ১০০ মাইক্রোগ্রাম ইনহেলারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৫০ টাকা। অথচ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়, (২) স্কয়ারের প্রতিটি সিপ্রোসিন ট্যাবলেট পাইকারি বিক্রি হয় ১৩ টাকায়। একই গ্রুপের কুইনক্স বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকা, ইনসেপ্টার বিউফ্লক্স ১৩ টাকা ও অ্যালবিয়নের সিপ্রোফ্লক্সিন ৩ টাকা ৫০ পয়সা। 

(৩) অ্যালবিয়নের প্রতিটি রেনিটিড ট্যাবলেট পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৬৩ পয়সা, ব্রিস্টলের নিওসেপটিন ৬৫ পয়সা। অথচ একই গ্রুপের ওষুধ স্কয়ারের নিওটেক ও বেক্সিমকোর নিওসেফটিন বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ২ টাকা ২৫ পয়সা, (৪) ওমিপ্রাজল ২০ এমজি স্কয়ারের প্রতিটি সেকলো পাইকারি বিক্রি করে ৪ টাকা ৩০ পয়সায়। এসকেএফের একই গ্রুপের লোসেকটিল বিক্রি হয় ৩ টাকা ২০ পয়সায়, ইনসেপ্টার ওমেনিক্স ৪ টাকা ৩০ পয়সায় ও অ্যালবিয়নের লোটিল ১ টাকায়, (৫) ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক গ্রুপের প্রতিটি ডাইক্লোফেন এসআর ট্যাবলেট অপসোনিন বিক্রি করছে ২ টাকা ৮০ পয়সায়। স্কয়ারের একই গ্রুপের ওষুধ ক্লোফেনাক এসআর বিক্রি হয় ৩ টাকা ৫০ পয়সায় ও অ্যালবিয়নের ক্লোফেন মাত্র ৯৫ পয়সায়, (৬) একইভাবে স্কয়ার ফার্মার প্রতিটি সেফ-৩ ট্যাবলেট বিক্রি হয় ৩১ টাকায়, ইনসেপ্টার এমিক্সোফ ২৮ টাকা ও অ্যালবিয়নের সেফিক্সিম ১৫ টাকায়, (৭) বেক্সিমকোর প্রতিটি নাপা ট্যাবলেটে থাকে ৬৬৫ এমজি প্যারাসিটামল, বিক্রি হয় ১ টাকা ৮০ পয়সায়। অথচ একই কোম্পানির ৫০০ এমজি প্যারাসিটামল সমৃদ্ধ প্রতিটি নাপা ট্যাবলেট বিক্রি হয় ৮০ পয়সায়; সরকারি হিসাবে প্রতি প্যাকেট খাবার স্যালাইন তৈরিতে ব্যয় সর্বোচ্চ ২ টাকা। অথচ স্যালাইন প্যাকেটের গায়ে লেখা খুচরা মূল্য ৪ টাকা ১৮ পয়সা। অথচ বাজারে বিক্রি হয় ৫-৬ টাকায়। কিন্তু সরকারি কোম্পানি ইউসিএল উৎপাদিত স্যালাইনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩ টাকা ৪৫ পয়সা, (৯) অপসোনিনের ২৫ এমজি একটি নাকের ড্রপের উৎপাদন ব্যয় ১ টাকা ৩ পয়সা, খুচরা বিক্রি হয় ২৫ টাকায়। আবার স্কয়ারের ১০ এমজি ও পপুলারের ১০ এমজি নাকের ড্রপ বিক্রি হয় যথাক্রমে ১৫ ও ২০ টাকা এবং সংকটে ৩৫ টাকার পেথিডিন বিক্রি হয় ৪০০-৫০০ টাকায়।’

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ওজন এবং পরিমাপ বিধিমালা ২০০৭-এর ৩২ বিধি অনুযায়ী ওষুধ কোম্পানিদের পণ্যের নিবন্ধন বিএসটিআই থেকে নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও নিবন্ধন ছাড়াই তারা বাজারে তাদের ওষুধ বিক্রি করে। আবার আমদানীকৃত নানা ধরনের ভ্যাকসিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বাজারে বিক্রি হয়। 

রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক সরকার। সেই ক্ষমতা কেবল জনগণের অধিকার ও স্বার্থরক্ষা এবং সার্বিক কল্যাণে ব্যবহার হয়। ওপরে বর্ণিত তথ্যাদিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রণালয়, পুলিশের এসবি, প্রতিযোগিতা কমিশন তথা সরকারের সব পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করে ওষুধসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবন দুর্ভোগের শিকার। তা থেকে পরিত্রাণের জন্য ক্যাবের প্রস্তাব, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন দুটি বাতিলসহ ওষুধের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে স্বার্থসংঘাত মুক্ত করার লক্ষ্যে কতিপয় সংস্কার এবং এসবির ১৭ দফা সুপারিশ। ফলে সরকার ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি প্রজ্ঞাপন বাতিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে বলেছে। অথচ ক্যাবের প্রস্তাব আমলে নেয়া এবং সরকারের নির্দেশনা প্রতিপালনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নিষ্ক্রিয়। 

ওষুধ শিল্প প্রতিনিধি যথার্থই বলেছেন, তাদের সমিতির সভাপতি সরকারের এমপি, ইচ্ছা করলেই ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি করা যায় না। তাই অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবন দুর্ভোগের শিকার, সরকারের সব পর্যায় থেকে তা বলা হলেও কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই মূল্যবৃদ্ধিকে মেনে নিতেই হবে! সভায় উপস্থিত মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের আর কিইবা বলার থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিদপ্তর পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার অভিযানে যায়। দরকারমতো মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার শুল্ক-কর-ভ্যাট কমায়। অভিযোগ না পেয়েও নিজে থেকে অভিযোগ আমলে নেয়। অথচ ওষুধের ক্ষেত্রে অভিযোগ করতে হবে। বাজার অভিযান হয় না। কারণ কি ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা? কিন্তু ক্যাব মনে করে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওষুধ শিল্প সমিতির রাবার স্ট্যাম্প এবং নিষ্ক্রিয় থেকে ওষুধ খাতে বিদ্যমান লুণ্ঠনমূলক মুনাফাকে সুরক্ষা দেয়। ওপরের ঘটনাপ্রবাহ তারই প্রমাণ।

শপথ গ্রহণের সময় একজন এমপি এই বলে শপথ করেন যে তিনি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন। তিনি আরো শপথ করেন যে তিনি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করবেন; তিনি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন। ওষুধ শিল্প প্রতিনিধির কথার পরিপ্রেক্ষিতে কি বলা যায়, ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি, যিনি এমপি, তার শপথের সঙ্গে আইন লঙ্ঘন করে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতাবিহীন বাজার সাংঘর্ষিক নয়?

এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের অধ্যাপক ও ডিন
সৌজন্যে- বণিক বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top