খোলা চুলার ধোঁয়ায় ঘরে বায়ুদূষণ কতটা ক্ষতিকর

মৃত্যুঞ্জয় রায়

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশ বা প্রায় ২৩০ কোটি মানুষ ঘরের ভেতরে খোলা চুলায় রান্না করেন। রান্নার কাজে কয়লা, কেরোসিন, গোবরের ঘুঁটে আর কাঠ–লাকড়ি ব্যবহার করেন। এসব চুলায় রান্নার ফলে ঘরের ভেতরে বায়ুদূষণ ঘটছে। এমন দূষণের কারণে ২০২০ সালে বিশ্বে প্রায় ৩২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব মানুষের মধ্যে ৩২ শতাংশের হৃদ্‌রোগে, ২৩ শতাংশের স্ট্রোকে, ৬ শতাংশের ফুসফুসের ক্যানসারে, ১৯ শতাংশের ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি রোগে ও ২১ শতাংশের শ্বাসজনিত সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২ লাখ ৩৭ হাজার শিশু ঘরের ভেতরে এভাবে রান্নার কারণে মারা যায়। প্রধানত ঘরের ভেতরে পরিবেশদূষণের ফলে সৃষ্ট শ্বাসজনিত সমস্যায় এসব মৃত্যু হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব চুলার ধোঁয়া শুধু ঘরেই আবদ্ধ থাকছে না, তা বাইরের বায়ুকেও দূষিত করছে। এতে ঘরের ও বাইরের বায়ু দূষিত হয়ে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটাচ্ছে। ঘরে ধোঁয়ার দূষণে বাড়ছে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মারাত্মক অসংক্রামক ব্যাধি। এই দূষণের শিকার প্রধানত নারী ও শিশুরা। ঘরে খোলা চুলায় লাকড়ির রান্নায় যে দূষণ হয়, তাতে ঘরের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে ক্ষতি হয়, তা দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট পানের সমান।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী

বাংলাদেশে প্রতি ১০টি বাড়ির মধ্যে ৯টি বাড়িতেই খোলা চুলায় গতানুগতিকভাবে রান্না করা হয়। ফলে বাংলাদেশে এটি একটি মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যা। শুধু ঘরের ভেতরের বায়ূদূষণের কারণে প্রতিবছর মোট মৃত্যুর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঘটছে। এরূপ চুলায় রান্নার সময় বাতাসে যে ছাই বা ক্ষুদ্র দূষক কণার সৃষ্টি হয়, সেগুলো নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে যায় এবং সব রক্ত সংবহনতন্ত্রে পরিবাহিত হয়। আবদ্ধ বা কম খোলামেলা ঘরে এসব দূষক কণার আধিক্য অনেক সময় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি থাকে।

ঠিক এক বছর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ বাংলাদেশের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু ঢাকা নগরের বায়ুদূষণ রোজ জনপ্রতি ১ দশমিক ৬টি সিগারেটের ধূমপানের সমান। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু সাত বছর কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের শিকার হয়ে প্রতিবছরই বেশি হারে মানুষ মরছেন। সব সময়ই গণমাধ্যমে শুধু ঘরের বাইরের বায়ুদূষণ নিয়ে সংবাদের শিরোনাম করা হয়; কিন্তু ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণে বছরে যে ঠিক কত লোক মারা যাচ্ছে, তার খবর কেউ প্রকাশ করে না। ডব্লিউওইচওর হিসাবে, ঘরের বায়ুদূষণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০২ জনের মৃত্যু হয়ে থাকে। ( দ্য ডেইলি স্টার, ৪ জুন ২০২২)।

বিস্তারিত পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top