গুগলি না নো বল?

প্রভাষ আমিন

বাংলাদেশের মানুষ খেলাপ্রিয়। একসময় ফুটবল ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বাংলাদেশের কোটি মানুষ মেতে থাকতো ফুটবলে। সাফল্যের পথ ধরে ক্রিকেট এখন ফুটবলের জায়গা দখল করেছে। তবে ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের রক্তে। তাই তো চারবছর পরপর ফুটবলের বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে শুরু হয় অন্যরকম মাতামাতি।

বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেনি, নিকট ভবিষ্যতে খেলবে; এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। তারপরও ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশে যা হয়, তা বিশ্বকাপ খেলে এমন অনেক দেশেও হয় না। বিশেষ করে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা এবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও নজর কেড়েছে। ফুটবলে ভালোবাসার জোয়ারে নতুন মাত্রা পেয়েছে বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা কূটনৈতিক সম্পর্ক। তবে আগেই যেমনটি বলেছি, সাফল্যের ছোঁয়ায় বাংলাদেশে ক্রিকেট জনপ্রিয়তায় ফুটবলকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।

ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা না থাকলেও ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সমীহজাগানো শক্তি। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলার যোগ্যতা অর্জন করা বাংলাদেশ এখন আরেকটি বিশ্বকাপের সামনে দাঁড়িয়ে। ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর থেকে ক্রিকেট বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার সিক্ত। বাংলাদেশের খেলা থাকলে স্টেডিয়ামে তিলধারণের ঠাঁই থাকে না। ক্রিকেট আমাদের বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।

ফুটবল বা ক্রিকেট যেমন খেলা, রাজনীতিও অনেকটা খেলার মতো। ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো রাজনীতিতেও জয়-পরাজয় আছে, আছে কিছু নিয়মনীতিও। যে কোনো খেলার জন্য একটা সমতল মাঠ লাগে, নিরপেক্ষ রেফারি বা আম্পায়ার লাগে। নিয়ম মেনে খেলতে হয়। নিয়ম না মানলে হলুদ কার্ড, লাল কার্ড বা নানা ধরনের শাস্তি পেতে হয়। রাজনীতিকেও যদি আমরা খেলা মানি, তাহলে রাজনীতি জন্যও একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, নিরপেক্ষ আম্পায়ার এবং নিয়ম মানা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে সমস্যা হলো কেউ নিয়ম মানতে চান না। সুযোগ পেলেই নিয়ম ভঙ্গ করা আমাদের রক্তে মিশে গেছে।

ইদানীং বিএনপি রাজনীতির মাঠে খেলতে নামলেও আওয়ামী লীগও সাথে নামে। সমান মাঠে দুই দল খেলতে নামলে কোনো অসুবিধা নেই। সমস্যা হলো, আওয়ামী লীগ মাঠে নামে পুলিশ নিয়ে। কখনো পুলিশ আওয়ামী লীগের পাশে থাকে, কখনো আওয়ামী লীগ পুলিশের পাশে থাকে। দুয়ে মিলে বিএনপির ওপর হামলা চালায়। কর্মসূচি পালন করে দুই দল। কিন্তু আক্রান্ত হয় একটি দল। আবার মামলা হয় আক্রান্তদের বিরুদ্ধে, গ্রেপ্তারও হয় তারাই।

আপনি চাইলে আরামসে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যোগ দিতে পারবেন। কিন্তু বিএনপির সমাবেশে যোগ দিতে চাইলেই পদে পদে বাধা, পথে পথে তল্লাশি। ইদানীং পুলিশ মানুষের মোবাইল চেক করছে, ফেসবুক চেক করে বোঝার চেষ্টা করছে তিনি আওয়ামী লীগ না বিএনপি। যেন বিএনপি করাটা অপরাধ, বিএনপির সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়াটা অন্যায়।

সাধারণ মানুষের মোবাইল চেক করে পুলিশ দুটি অপরাধ করছে- সমাবেশ-শোভাযাত্রায় যোগ দেওয়া মানুষের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এতে বাধা দিয়ে পুলিশ সংবিধান লঙ্ঘণ করছে। আর একটি মোবাইল মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটা চেক করে পুলিশ সেই ব্যক্তির প্রাইভেসি লঙ্ঘন করছে। এটাই আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। মজাটা হলো অপরাধ করে পুলিশ আর গ্রেপ্তার হয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাহলে মাঠটা সমতল হলো কীভাবে? রাজনীতির মাঠে রেফারি হওয়ার কথা নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু বিএনপির এই নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনো আস্থা নেই। নির্বাচন কমিশন বিরোধী দলের ওপর আস্থা অর্জনের মতো তেমন কিছু করেওনি। ফলে খেলাটা হয়ে যায় একতরফা।

বলছিলাম খেলার নিয়মকানুনের কথা। সেটাও কাগজে-কলমে আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অংশের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার সময় আমরা সংবিধানের কথা ভুলে যাই। জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের কথা আমরা ভুলে যাই। বাংলাদেশে আন্দোলন মানেই যেন জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত করা। যে যত বেশি মানুষ জিম্মি করতে পারবে, যত বেশি মানুষ মারা যাবে; সে আন্দোলন যেন তত সফল। শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার কথা বলা থাকলেও আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকে না, নিরস্ত্রও থাকে না।

বিএনপি গত ১২ জুলাই থেকে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে নেমেছে। একদফা দাবিতে গত ২৮ জুলাই নয়াপল্টনের মহাসমাবেশ করেছে বিএনপি। সেই মহাসমাবেশ থেকে হুট করে পরদিন রাজধানীর প্রবশপথগুলোতে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তাদের আশা ছিল মহাসমাবেশে আসা লোকজন দিয়েই তারা অবস্থান কর্মসূচি সফল করে ফেলবেন। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। প্রথমত তারা অবস্থান কর্মসূচির জন্য পুলিশের অনুমতি পায়নি। অনুমতি ছাড়াই অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। আগের দিন মহাসমাবেশে লাখো মানুষ জড়ো হলেও পরদিন অবস্থান কর্মসূচিতে কর্মী বা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা নির্ধারিত নেতারাও ছিলেন না। প্রবেশ পথের দুয়েক জায়গায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ানো ছাড়া বিএনপি কোনো অর্জনই করতে পারেনি এই কর্মসূচি থেকে। মহাসমাবেশে আসা জনগণকে নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে সরকারকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার মতো দম ছিল না তাদের। ফলে এখন আবার বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে ঢাকায় আসা নেতাকর্মীদের এলাকায় ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কোনটা গুগলি, কোনটা নো বল; সেটা তো নিজেরা দাবি করলে হবে না। বিচারটা করবে জনগণ। বিএনপির গুগলিতে আওয়ামী লীগ বোল্ডআউট হলো কি না, নাকি বলটা আসলে নো বল ছিল; সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। দুই দলই রাজপথে জয়-পরাজয় নির্ধারণে মরিয়া। কিন্তু আসল জয়-পরাজয় হবে নির্বাচনে। জনগণ রায় দেবে, কে বোল্ডআউট, কে চ্যাম্পিয়ন।

বিএনপির একদফা আন্দোলন সফল হবে কি না, সরকারের পতন হবে কি না জানি না। আসলে মাঠের এ আন্দোলন হলো নির্বাচনের আগেই মাঠ দখল রাখা, নিজেদের এগিয়ে থাকার বাতাবরণ তৈরি করা। এ কারণেই আওয়ামী লীগও বিএনপির পাশাপাশি মাঠে থাকে। যাতে বিএনপি একা মাঠ দখল করতে না পারে। এখন এই মাঠ দখলের জয়-পরাজয় নিয়েও পাল্টাপাল্টি চলছে।

২৮ জুলাইয়ের মহাসমাবেশ ও পরদিনের আচমকা অবস্থান কর্মসূচি সফল দাবি করে বিএনপি মহাসচিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপির গুগলিতে আওয়ামী লীগ পুরো বোল্ডআউট হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ বুঝতেই পারেনি, কোন দিক দিয়ে বলটা আসতেছে। ‘গুগলি হলো স্পিন বোলিংয়ের বিশেষ একটা কৌশল। যাতে ব্যাটসম্যানকে সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। মির্জা ফখরুল হয়তো মহাসমাবেশ থেকে পরদিনই অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণাকেই গুগলি বলেছেন। কিন্তু এই গুগলিতে যে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি বেশি বিভ্রান্ত হয়েছে, সেটা হয়তো মির্জা ফখরুল টের পাননি। আগের দিনের লাখো কেন পরদিন মাঠে নামলো না, নেতারাও কেন রাস্তায় ছিলেন না; সেটা কি ভেবে দেখেছেন মির্জা ফখরুল। তাহলে আন্দোলনের ওপর নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল না?

মির্জা ফখরুল কিছু বললে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার পাল্টা জবাব দেন। এই পাল্টাপাল্টি চলছে অনেকদিন ধরেই। আওয়ামী লীগ গুগলিতে বোল্ডআউট হয়ে গেছে; এ অভিযোগের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘মির্জা ফখরুল বলেছেন— আওয়ামী লীগকে গুগলি মেরে বোল্ডআউট করে ফেলেছে। গুগলি তো করেছেন, বল তো নো বল। নো বলে গুগলিও হবে না, বোল্ড আউটও হবে না।’

কোনটা গুগলি, কোনটা নো বল; সেটা তো নিজেরা দাবি করলে হবে না। বিচারটা করবে জনগণ। বিএনপির গুগলিতে আওয়ামী লীগ বোল্ডআউট হলো কি না, নাকি বলটা আসলে নো বল ছিল; সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। দুই দলই রাজপথে জয়-পরাজয় নির্ধারণে মরিয়া। কিন্তু আসল জয়-পরাজয় হবে নির্বাচনে। জনগণ রায় দেবে, কে বোল্ডআউট, কে চ্যাম্পিয়ন।

৬ আগস্ট, ২০২৩
লেখক: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ


সৌজন্যে- জাগো নিউজ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top