ডিএসএ থেকে সিএসএ নিপীড়নের দরজা বন্ধ হোক

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

একটি রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করা হয় মানুষের জন্য। কিন্তু সেই আইন যদি মানুষকে ভীত করে তোলে, যদি দেশে একটা ভয়ের সংস্কৃতি চালু করে তবে প্রশ্ন উঠবেই যে, সে আইন কীসের আইন? কার জন্য আইন? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এমন একটি আইন যার নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্ক বোধ করে। মানবাধিকার ও সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, কার্টুনিস্ট, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ—অতি অল্প সময়ে এ আইনে নিপীড়িত হওয়ার তালিকাটা অনেক দীর্ঘ।

দেশ-বিদেশে তুমুল সমালোচনা, ব্যাপক হারে আইনের অপপ্রয়োগের পাঁচ বছরের মাথায় এসে সরকার বহু বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ বাতিল করে নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩, আনার কথা ঘোষণা করল। গত সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বলা হয়, প্রস্তাবিত নতুন আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর সাজা থাকছে না, সাজার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে থাকা অজামিনযোগ্য ধারা কমিয়ে নতুন আইনে জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হয়েছে।

এ আইনটি পাসের আগে এবং পরে দেশের সাংবাদিক সমাজ, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা শত আর্জি জানিয়েও সরকারকে নড়াতে পারেনি। অবশেষে এ বছর এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফোলকার টুর্ক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানান। এরপর জুনে এ আইন পর্যালোচনা করে সংশোধনের একটি বিস্তারিত নীতিমালা সরকারকে পাঠানো হয় টুর্কের অফিস থেকে। সাম্প্রতিককালে নির্বাচন নিয়ে বিদেশি কূটনীতিক ও সংস্থার আলাপেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে কথা ওঠে। অবশ্য আইনমন্ত্রী সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস গিল্ড, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক আলোচনায় এ আইনে সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে এ আইন সংসদে উত্থাপন করে মাত্র কয়েক মিনিটেই পাস করিয়ে নেয় সরকার। এ আইন পাস করে, প্রয়োগ করে এবং হাজারো সমালোচনার পরও বজায় রেখে সরকার বা দেশের কী লাভ হয়েছে সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে কখনো জানাতে পারেনি। তবে এ আইন যে দেশে একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, এতে সন্দেহ নেই। আইন চালু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভুগেছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিক আর সাংবাদিকরা এবং অবশ্যই ভিন্নমতের রাজনীতিকরা। একটা পর্যায়ে দেখা গেছে অপপ্রয়োগ করা লাগেনি, প্রয়োগটাই অপপ্রয়োগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সমাজবিরোধী ও দুর্নীতিবাজ, সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে নিপীড়নের অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এ আইনের ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে এবং মূলত এ আইন যথেচ্ছ প্রয়োগের কারণে মতপ্রকাশের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে এসে ঠেকেছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের করা বার্ষিক সূচকে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অবনতির দিকে ধাবমান। দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে এক বা দুই ধাপ করে নামলেও ২০২২ সালে একলাফে ১০ ধাপ নেমে যায়। বলা হয়, এর বড় অবদান এসেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে।

এ আইন প্রয়োগের শুরু থেকেই অপপ্রয়োগের অভিযোগ উঠতে থাকে। ২০০৯ সালে সরকার তথ্য অধিকার আইন করে সরকারি দপ্তর-পরিদপ্তরে তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে যে অবদান রেখেছিল, সেটা তিরোহিত হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। তথ্য অধিকার আইনে যেখানে অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল, এ আইনে শতবছরের পুরোনো আইন ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের তথ্য প্রদানের পথ বন্ধ করে দিল। প্রান্তিক পর্যায়ে সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এ আইনের বড় ভিকটিম হয়েছেন। শাসক দলের দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মী এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মকারী সরকারি কর্মকর্তারা যাচ্ছেতাইভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা করে পুলিশকে দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়েছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হিন্দুদের একটা আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে। ফেসবুকে, ইউটিউবে নিজেরা গোঁড়ামি উৎসাহিত করে, দেশবিরোধী বক্তব্য প্রচার করে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ কনটেন্ট যে-ই দিতে চেয়েছে, তাকেই এ আইনে হয়রানি করেছে।

আইমন্ত্রী পরিষ্কার করে বলেছেন যে, সাইবার নিরাপত্তার জন্য যেসব ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল, সেই ধারাগুলো প্রস্তাবিত আইনে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যেসব বিষয়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো, প্রস্তাবিত আইনেও সেগুলো অপরাধ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২১ ও ২৮ ধারা সম্পূর্ণ বিলোপের আহ্বান রেখেছিল, কিন্তু সেটা হয়নি।

তবে অনেক ধারা, যেমন মানহানির ধারায় আগে শাস্তি ছিল কারাদণ্ড। প্রস্তাবিত আইনে সেটি পরিবর্তন করে করা হয়েছে জরিমানা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারায় মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিদান ছিল। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতো। প্রস্তাবিত নতুন আইনে এ অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অনধিক ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জরিমানা না দিলে তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। মামলা হলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানোর প্রক্রিয়াটা বন্ধ হলেও ২৫ লাখ টাকা অতি বেশি বলেই প্রতীয়মান হয়; যদিও সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকছে। তা ছাড়া প্রচলিত আইনে যেখানে মানহানির বিচার করা সম্ভব, সেখানে কেন আলাদা করে ডিজিটাল আইনের প্রয়োজন পড়ছে? আইনের ধারা-২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে এ সাজা কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক বিষয় এবং গবেষণাও হবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভাবা দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এ ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। আর এ অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সাজা আরও বেশি হবে। প্রস্তাবিত আইনে এটি জামিনযোগ্য করা হয়েছে (আগে অজামিনযোগ্য ছিল) এবং সাজা কমানো হয়েছে। এখন এই অপরাধে সাজা হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। এ আইনটির অপপ্রয়োগ হয়েছে হিন্দু ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে। প্রস্তাবিত আইনে যে দুই বছর রাখা হয়েছে, সেটিও ন্যায্য নয়। আসলে এ ধারাটি বাতিলই করা উচিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো বা ঘটার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে এ সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। আমাদের প্রচলিত আইনে কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এটি কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। সাত বছরও অতিরিক্ত এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য প্রতিবন্ধক, কারণ সাংবাদিকরা বলেকয়ে, জানিয়ে কোন স্থাপনায় গিয়ে দুর্নীতির খবর নেবেন? আমার মনে হয় সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল সাইবার কনটেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি আর সাইবার প্রটেকশন বিষয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলেছেন। একটি বহুত্ববাদের সমাজে সামাজিক মাধ্যম, নেট দুনিয়ায় কত কিছুই থাকে এবং থাকবে। বিদেশে বসে যারা আজেবাজে তথ্য দিচ্ছে তাদের কিছুই করতে পারছে না সরকার। শুধু দেশে অবস্থানকারী সাধারণ মানুষ হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। মানুষকে যথাযথ সাইবার প্রটেকশন দেওয়াটাই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ আইনে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যখন-তখন যে কোনো ব্যক্তির মোবাইল বা অন্য ডিভাইস চেক করার বা বাজেয়াপ্ত করার। নতুন আইনে এ ক্ষমতা থেকে গেলে নাম বদল হলেও হয়রানি কমবে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটি নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত হয়েছিল। ডিজিটাল স্পেসে বিদ্বেষ, হিংসা ছড়ানোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু কোনটা সত্যিকারের বিদ্বেষ ছড়ানো আর কোনটা রাজনৈতিক মতামত সেটি বুঝতে পারতে হবে, সেই সহনশীলতা থাকতে হবে। নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতা যেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো না হয়। সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকবান্ধব ও মতপ্রকাশবান্ধব হোক। আলোচনা হোক সব অংশীজনের সঙ্গে। একটি গ্রহণযোগ্য আইন আর তার যৌক্তিক প্রয়োগই হোক উদ্দেশ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও এর বিধির ন্যায্যতা-অন্যায্যতা নিয়ে যে ঘোর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা যে কিছুটা পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে, সেটা স্বস্তির কথা। আইন ও আইনের দর্শন তো স্থাণু হতে পারে না, তা একটি চলমান বিষয়। সমাজের মতোই।

আইমন্ত্রী পরিষ্কার করে বলেছেন যে, সাইবার নিরাপত্তার জন্য যেসব ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল, সেই ধারাগুলো প্রস্তাবিত আইনে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যেসব বিষয়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো, প্রস্তাবিত আইনেও সেগুলো অপরাধ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২১ ও ২৮ ধারা সম্পূর্ণ বিলোপের আহ্বান রেখেছিল, কিন্তু সেটা হয়নি।

তবে অনেক ধারা, যেমন মানহানির ধারায় আগে শাস্তি ছিল কারাদণ্ড। প্রস্তাবিত আইনে সেটি পরিবর্তন করে করা হয়েছে জরিমানা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারায় মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিদান ছিল। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতো। প্রস্তাবিত নতুন আইনে এ অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অনধিক ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জরিমানা না দিলে তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। মামলা হলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানোর প্রক্রিয়াটা বন্ধ হলেও ২৫ লাখ টাকা অতি বেশি বলেই প্রতীয়মান হয়; যদিও সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকছে। তা ছাড়া প্রচলিত আইনে যেখানে মানহানির বিচার করা সম্ভব, সেখানে কেন আলাদা করে ডিজিটাল আইনের প্রয়োজন পড়ছে? আইনের ধারা-২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে এ সাজা কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক বিষয় এবং গবেষণাও হবে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভাবা দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এ ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। আর এ অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সাজা আরও বেশি হবে। প্রস্তাবিত আইনে এটি জামিনযোগ্য করা হয়েছে (আগে অজামিনযোগ্য ছিল) এবং সাজা কমানো হয়েছে। এখন এই অপরাধে সাজা হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। এ আইনটির অপপ্রয়োগ হয়েছে হিন্দু ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে। প্রস্তাবিত আইনে যে দুই বছর রাখা হয়েছে, সেটিও ন্যায্য নয়। আসলে এ ধারাটি বাতিলই করা উচিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো বা ঘটার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে এ সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। আমাদের প্রচলিত আইনে কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এটি কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। সাত বছরও অতিরিক্ত এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য প্রতিবন্ধক, কারণ সাংবাদিকরা বলেকয়ে, জানিয়ে কোন স্থাপনায় গিয়ে দুর্নীতির খবর নেবেন? আমার মনে হয় সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল সাইবার কনটেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি আর সাইবার প্রটেকশন বিষয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলেছেন। একটি বহুত্ববাদের সমাজে সামাজিক মাধ্যম, নেট দুনিয়ায় কত কিছুই থাকে এবং থাকবে। বিদেশে বসে যারা আজেবাজে তথ্য দিচ্ছে তাদের কিছুই করতে পারছে না সরকার। শুধু দেশে অবস্থানকারী সাধারণ মানুষ হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। মানুষকে যথাযথ সাইবার প্রটেকশন দেওয়াটাই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ আইনে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যখন-তখন যে কোনো ব্যক্তির মোবাইল বা অন্য ডিভাইস চেক করার বা বাজেয়াপ্ত করার। নতুন আইনে এ ক্ষমতা থেকে গেলে নাম বদল হলেও হয়রানি কমবে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটি নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত হয়েছিল। ডিজিটাল স্পেসে বিদ্বেষ, হিংসা ছড়ানোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু কোনটা সত্যিকারের বিদ্বেষ ছড়ানো আর কোনটা রাজনৈতিক মতামত সেটি বুঝতে পারতে হবে, সেই সহনশীলতা থাকতে হবে। নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতা যেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো না হয়। সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকবান্ধব ও মতপ্রকাশবান্ধব হোক। আলোচনা হোক সব অংশীজনের সঙ্গে। একটি গ্রহণযোগ্য আইন আর তার যৌক্তিক প্রয়োগই হোক উদ্দেশ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও এর বিধির ন্যায্যতা-অন্যায্যতা নিয়ে যে ঘোর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা যে কিছুটা পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে, সেটা স্বস্তির কথা। আইন ও আইনের দর্শন তো স্থাণু হতে পারে না, তা একটি চলমান বিষয়। সমাজের মতোই।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন

সৌজন্যে- কালবেলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top