
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
উন্নয়নের হিংস্র উন্মাদনায় অসুস্থ ব্যবস্থায় তরুণ ও তারুণ্য উভয়ের পক্ষেই আজ সুস্থ থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মনের ব্যাধি অনেক ক্ষতিকর শরীরের ব্যাধির তুলনায়। তরুণ ও তারুণ্যের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক ব্যাধিটা হলো হতাশা।
শুধু বাংলাদেশ বলে নয়, গোটা বিশ্বেই বুর্জোয়া গণতন্ত্র এখন বেশ ভালো রকমের মুশকিলের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট পুঁজিবাদেরই সংকট। পুঁজিবাদ এখন তার অন্তিম সময়ে এসে পৌঁছেছে। তাই তো দেখা যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ঘরে-বাইরে নিন্দিত এক লোকও পুনরায় নির্বাচিত হয়ে আসবেন—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এবং সেটা ঘটতে পারে গণতন্ত্রের তীর্থস্থান বলে স্বীকৃত খোদ আমেরিকাতেই। অন্যত্রও দক্ষিণপন্থীরাই নির্বাচিত হয়ে আসছে। যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, তারা পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনটা ঘটানোর ক্ষমতা পুঁজিবাদ রাখে। পুঁজিবাদের যেটা স্বভাবগত, সেটাই সে করে চলেছে। করতলগত অর্থ, কূটকৌশল, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন হাতিয়ার ব্যবহার করে এবং মানবতাবিদ্বেষী বর্ণবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ইত্যাদি প্রচারে সামান্যতম বিরতি দিচ্ছে না।
সভ্যতার হাজার হাজার বছর ধরে অর্জিত জ্ঞান ও অর্জনের সমস্তটা নিয়ে মানুষ একটি খাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সভ্যতা কী বিপজ্জনক, যে পথ ধরে এগোচ্ছে, সেই পথ ধরেই এগোবে এবং যাদের মধ্যে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে; নাকি পথ বদলে, ব্যক্তিমালিকানাকে পরিত্যাগ করে, সামাজিক মালিকানার দিকে এগিয়ে নিজেকে এবং মানবজাতিকেও বাঁচাবে? বাঁচাবে প্রাণী এবং প্রকৃতিকেও? এক কালে এই ধরাধামে ডাইনোসর নামে বিরাটাকার এক প্রাণী ছিল। তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে; মানব প্রজাতিও কি সেভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে? এবং সেই ধ্বংসের জন্য অন্য কেউ নয়, দায়ী হবে সে নিজেই? সমস্ত কিছুই তো ভেঙেচুরে যাচ্ছে। মানবিক সম্পর্কগুলো আর মানবিক থাকছে না। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আশার আলো দেখায় না। তা ছাড়া এগুলো নমুনামাত্র। এদের তুলনায়ও কত কত ভয়ংকর ঘটনা যে প্রতিনিয়ত ঘটছে, যার খবর আমরা রাখি না এবং না রাখাটাই হয়তো মঙ্গলজনক, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য।
আমরা আশা করব ভয়ংকর এই ধ্বংসকাণ্ড ঘটবে না। কিন্তু না ঘটানোর জন্য তো চেষ্টার দরকার হবে। সেই প্রচেষ্টা কে করবে? জবাব হলো, করবে মানুষের তারুণ্য। তরুণ না বলে তারুণ্যের কথাই বলতে হয়। কেননা, তারুণ্য বয়সনির্ভর নয়, গুণনির্ভর বটে। কোনো তরুণই তরুণ নয়, যদি তার ভেতরে তারুণ্য জিনিসটা না থাকে। সে জন্য দেখা যায় তরুণও অকালে বৃদ্ধ হয়ে পড়ে, আবার বৃদ্ধের মধ্যেও তারুণ্য জীবন্ত ও কার্যকর থাকে।
যথার্থ তরুণের কথাই ভাবতে হবে। আজ যারা তরুণ, তাদের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ—তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং সমগ্র দেশের ভবিষ্যৎ। কারণ ভবিষ্যতে তারাই থাকবে এবং তাদের হাতেই থাকবে তাদের ভবিষ্যৎ; যদি থাকে।



