ধর্মান্ধ অপশক্তি মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ

অরুণাভ পোদ্দার

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতায় ফিরে এল। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যতটা অভ্যন্তরীণ বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, তার থেকে বহুগুণ বেশি বাইরের দেশগুলোর তীব্র নজরদারিতে ছিল। গত বছর দেড়েক থেকেই বিশ্বমোড়ল আমেরিকাসহ পুরো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্যে নাক গলানো ছিল দৃষ্টিকটু। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন ও রাশিয়ার প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারটিও ছিল চোখে পড়ার মতো। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্ব-পশ্চিমের সেই চাপ দক্ষ হাতে সামলেছেন নিঃসন্দেহে।

নির্বাচনের পরে সংসদ সদস্যদের শপথ ও নতুন মন্ত্রিসভা যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিরোধী শিবিরের আড়ালে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর চাপ উড়িয়ে দেওয়ার নয়। এর মধ্যেই কিছু আলামত দৃশ্যমান হচ্ছে। প্রথমেই এরা সরকারকে চাপে ফেলতে চাইছে সরকারের নতুন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। এই যে ব্র‍্যাকের খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাবকে দিয়ে তৃতীয় লিঙ্গ ইস্যুতে প্রকাশ্যে পাঠ্যবইয়ের পাতা ছিঁড়ে নাটক সাজানো হলো, এর পেছনেও কিন্তু তাদের অদৃশ্য হাতের কারসাজি বিদ্যমান। এর নেপথ্যের কুশীলবেরা কিন্তু সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা নিয়ে মাঠ গরম করার পরিকল্পনায় নেমেছে। কিন্তু এবারও সরকার তা শক্ত হাতে মোকাবিলা না করে বরং আপস ও সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে দেখে মনে আশঙ্কার মেঘ জমে উঠছে। অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আওয়ামী লীগ যখন শক্ত হাতে সব ধরনের চক্রান্ত মোকাবিলা করেছে, তখন তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, আর যখনই সেই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেছে, তখনই এরা আশকারা পেয়ে মাথায় উঠেছে।

২০০৮-এর সর্বমহল স্বীকৃত নির্বাচনের ভূমিধস বিজয়ের অব্যবহিত পরেই বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে একটি অপশক্তি প্রথমেই সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাহসে সে যাত্রায় আওয়ামী লীগ তাদের নৌকার হাল স্থির রেখেছিল। এর পরে ২০১০-১১তে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের নেতৃত্বে যুগান্তকারী নারীনীতির খসড়া ঘোষিত হয়। আওয়ামী লীগের সরকার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় মুসলিম নারীদের সম্পত্তিতে সমান অধিকারের। অর্থাৎ, ছেলে-মেয়ে সবার মাঝে সম্পত্তি সমানভাবে বণ্টন করতে হবে। কিন্তু সেই যাত্রায় একটি চিহ্নিত ধর্মান্ধ মহল, চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও তৎকালীন বিরোধী দলের সহায়তায় সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। মনে রাখতে হবে, সরকার কিন্তু তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ধর্মান্ধদের ব্যবহার করে একটি চিহ্নিত মহল যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সরকারকে বিব্রত করতে চায়। এর বিপরীতে সরকার নমনীয় কৌশলের রাস্তা গ্রহণ করে। ফলে সেই নারীবান্ধব নীতি পর্দার আড়ালে চলে যায়। এর পরপরই ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে শাহবাগে ঐতিহাসিক গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি। ’৭১-এর পর সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবি নিয়ে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্র স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিপক্ষ শক্তি জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসরদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু এর পরই শুরু হয় ষড়যন্ত্র। শুরু হয় মিথ্যা অপবাদে ব্লগার হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়ন। হেফাজতে ইসলামের মতো চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান ঘটে। এদের উন্মত্ততা চরমে ওঠে ২০১৩-এর ৫ মে, যখন সারা দেশ থেকে এরা ঢাকা অবরোধের মতো উচ্ছৃঙ্খল কর্মসূচির ডাক দেয়।

সরকার প্রথমে চরম সহনশীলতার পরিচয় দিলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দক্ষভাবে এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মোকাবিলা করেন এবং ঢাকা থেকে উচ্ছেদ করেন। সারা দেশের মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণ যখন এদের বিচারের আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষায়, তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভুল চাল দিল। বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আহ্বান করল। এতে যেন মৃতপ্রায় হেফাজতের দেহে প্রাণ ফিরে এল। জাতি প্রত্যক্ষ করল রক্তবীজের পুনরুত্থান। মে মাসের ৫ তারিখ যে হেফাজত ঢাকা ছেড়ে পালিয়েছিল, তাদের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, সরকারের নির্বাচন ঘোষণায় তারা প্রকাশ্যে চলে এল। এর ফল তারা হাতেনাতে পেল। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেরে গেল আওয়ামী লীগ। সরকারের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেল, তাদের নীতিনির্ধারক মহলে এই ধারণা বদ্ধমূল হলো, হেফাজতকে আর চটানো ঠিক হবে না। ফলে সরকারের ওপরমহল থেকে হেফাজতের মতো উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে আপসের উদ্যোগ নেওয়া হলো। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি রেলের জমি তাদের নেতাদের কাছে লিজ দেওয়া হলো, নেতাদের ৫ মের মামলা হিমঘরে চলে গেল, কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির সমমূল্যায়ন করা হলো।

বিস্তারিত পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top