‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে’র পর নিয়ন্ত্রিত সংসদ!

হাসান মামুন

গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে যে ধরনের সংসদ পাওয়ার কথা, তেমনটাই পেয়েছি। এ নিয়ে আক্ষেপের কিছু নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকলে যেমন নির্বাচন আয়োজনে সরকারের সুবিধা, তেমনটিরই ব্যবস্থা হয়েছিল। সেটা নিয়ে নতুন করে আর আলোচনার কী আছে! তবে নির্বাচনটি একাডেমিক আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে এর কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে। ক্ষমতাসীন দলের ভেতর থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতে যেভাবে সংসদে এসেছেন, তা এটিকে কিছুটা নতুন রূপ দিয়েছে বৈকি। অতঃপর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের বলা হয়েছে স্বতন্ত্র হিসেবে থেকেই ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ রাখতে। সংসদের বিরোধী দল হিসেবে শেষতক স্বীকৃতি পাওয়া জাতীয় পার্টি (জাপা) বলছে, তারাও ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ রাখবে। কোন ভূমিকা ‘গঠনমূলক’ আর কোনটি তা নয়, সেটা নিশ্চয় স্থির করে দেওয়া হবে ‘কেন্দ্র থেকে’। সর্বোপরি একটা ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’-এর পর একটা নিয়ন্ত্রিত সংসদই গঠিত হয়েছে।

এর কার্যক্রম শুরুর লগ্নে তবু অনেককে দেখা যাচ্ছে সংসদের কাছে কিছু প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে। এটা স্বীকার করেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হচ্ছে, সংসদটি সরকারপক্ষীয়। গণভবনে আয়োজিত বৈঠকে বিএনপি থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে জিতে আসা একজনকে বর্ণনা করা হলো সরকারপক্ষীয় বলে! নির্বাচিত ৬২ স্বতন্ত্র এমপির মাত্র তিনজন এমন আছেন। তারাও ভিন্ন কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন বলে মনে হয় না। ক্ষমতাসীন জোটের যারা নৌকা নিয়ে কোনোমতে জিতে এসেছেন, তারা সরকারের প্রতি আরও বিনয়ী হবেন। বেফাঁস কথা এর আগে বলে ফেললেও এবার আর বলবেন না। বললেই বা কী! সরকার কোনো কিছুরই পরোয়া করবে না– এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে গেছে। জিততে না পারা সরকারদলীয় প্রার্থীরাও কত কী বললেন নির্বাচন নিয়ে! তাতে কী যায় আসে সরকারের? নির্বাচনের পরও ‘নিজেদের মধ্যে’ হানাহানি চলছে। তাতেই বা কী যায় আসে! বরং বলা যেতে পারে, আরও বেশি হানাহানি হতে পারত। আর যেটুকু হচ্ছে, সেটাও ‘নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে আসা হবে!

এমন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থায় অনেকে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেও অপরপক্ষকে দেখা যাচ্ছে ভারমুক্ত। তারা এমনটাই চেয়েছিলেন। এখন হয়তো চাইবেন, সংসদের বাইরে যে রাজনীতি, সেটাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হোক। সত্যি বলতে, ২০১৪ সাল থেকেই সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রয়েছে সংসদের বাইরে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কী মনে করে তারা গিয়েছিলেন, সেটা এক রহস্য। তখন থেকে এ নিয়ে নানা আলাপ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নির্বাচনে না গেলে নিবন্ধন না জানি বাতিল হয়ে যায়– এমন উৎকণ্ঠাও কি ছিল না? নিবন্ধন না থাকলেও মাঠে রাজনীতির সুযোগ থাকে। সংসদের বাইরে সে রাজনীতিটাও সামনে তারা করতে পারবেন কিনা– এ প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে। সংসদ কতটা কী ‘কার্যকর’ হয়, তার চেয়ে এ বিষয়ে বরং আগ্রহ আছে মানুষের। যারা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাকে দৃঢ়তর করার পক্ষে, তারাও এর পরবর্তী পর্ব দেখতে কম আগ্রহী নন।

এ ধরনের আলাপও অনেককে করতে দেখছি, এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছার জন্য বিএনপির ‘ভুল রাজনীতি’ই দায়ী। বারবার তারা ভুল পদক্ষেপ নিয়ে নিজের বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং দেশকেও ঠেলে দিচ্ছে কার্যত একদলীয় ব্যবস্থার দিকে। তার ‘অপরাধ’-এর তালিকাও তুলে ধরা হচ্ছে। উপসংহারে বলা হচ্ছে, এর সুযোগ তো ক্ষমতাসীনরা নেবেই। আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি থাকলে তারাও একইভাবে সুযোগ নিত বলে বয়ান হাজির করা হচ্ছে। রাজনীতি যেন কেবল ‘সুযোগ নেওয়া’র ব্যাপার! যে কোনো মূল্যে প্রতিপক্ষকে প্রান্তিক বানানো; পারলে মুছে ফেলার ব্যাপার। এর ভেতর দিয়ে গণতন্ত্রের অবশেষটুকুও মুছে গেলে একটা জাতির যেন কিছুই যায় আসে না! গণতন্ত্র নিঃশেষ হয়ে এলেও ‘উন্নয়নের ধারা’ বহাল থাকবে– এমন তত্ত্বও হাজির করা হচ্ছে। এ অবস্থায় গণতন্ত্রের ‘ভিন্ন মডেল’ অনুসৃত হতে পারে বলেও দেওয়া হচ্ছে বক্তব্য। এর তত্ত্বায়নে উৎসাহভরে এগিয়ে আসা কিছু বিজ্ঞজনকে হয়তো অচিরেই দেখা যাবে দৃশ্যপটে।

বিস্তারিত পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top