প্রকৃতির ওপর যুদ্ধের আঁচড়

নাভিদ সালেহ

পুড়ছে ইউক্রেন। আগ্রাসনের ৭০০ দিন পেরিয়ে গেছে। জ্বলছে গাজা। প্রজ্বালনের ১০০ দিন অতিক্রান্ত। বিরামহীন বোমার আঘাতে প্রকম্পিত হতে শুরু করেছে ইয়েমেনের হুতি অধ্যুষিত এলাকা। এসব অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য কিংবা কৃষ্ণ সাগর-তীরবর্তী হওয়ায় হয়তো বোমার শব্দ, আহতের আর্তনাদ কিংবা স্বজনহারার হাহাকার পশ্চিমা বিশ্বের সাজানো বৈঠকখানা পর্যন্ত পৌঁছে না। এশিয়ার তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর অত্যাধুনিক আবদ্ধ মিডিয়া রুমের আবহ হয়তো এ আকুতিকে রুখে দিতে সমর্থ হয় তার বিলাসবহুল দরজায়।

তবে এই আধুনিক সমাজের মানুষ ভুলে যায়, যুদ্ধের গোলাবারুদ আর ভারী কিংবা রাসায়নিক অস্ত্রের প্রভাব কেবল প্রয়োগকৃত স্থান বা প্রয়োগের সময়েই আটকে থাকে না। এই লেলিহান অগ্নিশিখা ইউক্রেনের; এই অগুনতি মৃত্যু গাজার; এই অন্তহীন ধ্বংসের শুরু ইয়েমেনের বটে, তবে পরিবেশ লাঞ্ছনার এ অনস্বীকার্য ক্রিয়াকর্ম আমাদের সবার। এর প্রভাব একটি সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক ছাপ রেখে যায়, যা থেকে উত্তরণ ঘটতে শতাব্দীর পর শতাব্দী লেগে যেতে পারে। যুদ্ধবাজ নেতা বা আগ্রাসী পরাশক্তিকে এ বোধোদয় ঘটাবে কে? 

সমরতত্ত্ব নিয়ে চর্চা হয়েছে বিস্তর, বিশেষত সমরের স্বভাব বনাম তার চরিত্র নিয়ে। প্রুশিয়ার কার্ল ভন ক্লসউইৎজকে ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সমরতাত্ত্বিক বলে ধরা হয়। তাঁর মতে, যুদ্ধের স্বভাব কখনও বদলায় না। ভূমি, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা কখনও কখনও অধ্যাত্মবাদকে পাওয়ার প্রেষণায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় মানুষ। দখলের নেশা এবং তাকে প্রতিরোধের সংকল্প যুদ্ধের স্বভাবকে চিহ্নিত করে। আকাডিও কিংবা আসিরীয় যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এ-কালের সংঘাতের স্বভাব তাই দখল ও প্রতিরোধের চক্রেই ঘুরপাক খেয়েছে। 

তবে যুদ্ধের চরিত্র পাল্টায় এবং পাল্টেছে। রণকৌশল, ব্যবহৃত অস্ত্র, প্রযুক্তি– এ সবই সময়ের সঙ্গে বদলায়। মেসোপটেমিয়ার আসিরীয় যুদ্ধ, রোমান কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারে সংঘাত, চেঙ্গিস খাঁর দখলি যোদ্ধাদের আক্রমণে গোলাবারুদ ব্যবহৃত হতো না। সম্মুখ সমরে উন্মুক্ত তরবারি হাতে লড়েছে তারা। নবম শতকে চৈনিক ট্যাং ডাইন্যাস্টির সময় বিস্ফোরক আবিষ্কৃত হলেও শুধু চৌদ্দ শতকের দিকে এর ব্যবহার হয়েছে কামানের গোলায়। এর পর এসেছে আধুনিক অস্ত্র, বিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্র এবং হালের অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন বোমা ও রাসায়নিক অস্ত্র। যুদ্ধের কৌশল তাই বদলাতে বাধ্য হয়েছে সমর দল। তবে সমর-উপঢৌকনের এই রূপান্তর একটি দিকে ধাবিত হয়েছে নিশ্চিত। তা হলো অধিক থেকে অধিকতর দূরত্বে অবস্থান করে, কম সময়ে সর্বাধিক ক্ষতিসাধন ও সর্বব্যাপক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর প্রতিযোগিতায় নিমগ্ন হওয়া। এর ফলাফলও স্পষ্ট। জীবনহানি যুদ্ধের এক অমোঘ সত্য। পাশাপাশি ভূমি, জল, বায়ু, চরাচর, উদ্ভিজ্জ; অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের মাত্রা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। যে কোনো আধুনিক যুদ্ধের এই অবাঞ্ছিত ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম, নিজ দেশ ও দখলকৃত এলাকার বাইরে এর হানিকারক প্রভাবকে ছড়িয়ে দেওয়ার বাস্তবতায় বাঁচতে হচ্ছে আমাদের সবাইকে। 

বিস্তারিত পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top