মিয়ানমারের পটপরিবর্তন কি আসন্ন

এ কে এম শামসুদ্দিন

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির সরকারের বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শাসনক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয় মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। বর্তমানে সশস্ত্র বিদ্রোহী দলগুলোর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে পড়ে তারা নাস্তানাবুদ হচ্ছে। জান্তা বাহিনী সীমান্ত শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গিয়ে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে টিকে থাকতে পারছে না। বিদ্রোহী দলগুলো একের পর এক শহর দখল করে নিচ্ছে। তাদের এই অভিযানে সে দেশের তরুণেরাও অংশগ্রহণ করছে।

কাচিন, কারেন, চিন ও রাখাইনদের পাশাপাশি সু চির সমর্থক বামারদের একাংশ সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী সশস্ত্র দলগুলো হলো—তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি বা টিএনএলএ, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি বা এমএনডিএএ এবং আরাকান আর্মি বা এএ। এই তিন সংগঠনই পৃথক জাতিসত্তার আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠনগুলো মিলেই ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গড়ে তুলেছে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের মধ্যে প্রথম দুটি মিয়ানমার-চীন সীমান্তে সক্রিয়। এদের অবস্থান তাং ও ককং জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে। এএ বা আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন আরাকানের রাখাইন অঞ্চলে সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা জারি রেখেছে।

এই মুহূর্তে মিয়ানমারের বেশ কিছু অঞ্চলে সম্মিলিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তা বাহিনীর ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর বৃহত্তর সশস্ত্র এই তিন দল সমন্বিতভাবে জান্তা সামরিক বাহিনীর ওপর সম্মিলিত আক্রমণের সূচনা করে। তার পর থেকেই তারা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে চলেছে। সর্বশেষ খবর হলো, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাত থেকে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এবং ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর পালতোয়া দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি আরাকান আর্মি। পালতোয়া চিন রাজ্যে অবস্থিত। সমগ্র পালেতোয়া এলাকায় অবস্থিত সামরিক বাহিনীর সব ক্যাম্প দখল করে নিয়েছে বলে আরাকান আর্মি দাবি করেছে। গত অক্টোবরে সম্মিলিত আক্রমণ সূচনার পর কয়েক ডজনেরও বেশি শহর দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহী জোট। এর মধ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কয়েক শ সামরিক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আউটপোস্ট অন্তর্ভুক্ত আছে।

এ বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে চীন সীমান্তের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শহর লুয়াক্কাই দখল করে নেয় সশস্ত্র ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের যোদ্ধারা। সেই যুদ্ধে জান্তা বাহিনীর ২ হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উইলসন সেন্টার’-এর এক বিশ্লেষক খবরটি নিশ্চিত করে জানান, আত্মসমর্পণ করার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদের ছয়জন কর্মকর্তাকে সামরিক আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। শাস্তি হিসেবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড, নাকি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জান্তা বাহিনী এমন খবর নাকচ করে দিয়েছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবরের অভিযানের পর এযাবৎ ৪ হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য পালিয়ে গেছেন অথবা আত্মসমর্পণ করার তথ্য জানা গেছে।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মোট ১৪ হাজার সেনাসদস্য বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে এত অধিকসংখ্যক সেনাসদস্যসহ অপারেশনাল কমান্ডারদের আত্মসমর্পণ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের একের পর এক পরাজয়ের ঘটনা সাধারণ সৈনিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সামরিক বাহিনীর সব স্তরের সদস্যদের মনোবল চাঙা রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৈনিকদের মনোবল যদি একবার ভেঙে যায়, তাহলে সেই সব সেনাসদস্য নিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেকোনো কমান্ডারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

বিস্তারিত পড়ুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top