
ড. আর এম দেবনাথ
দেশে দিন দিন ব্যাংক আমানত বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন, ব্যাংক আমানত কি দেশের বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, গ্রামীণ আমানত কেন দিন দিন কমছে? তৃতীয় প্রশ্ন, ঢাকার আশপাশের অঞ্চলেও কেন এত কম মাথাপিছু আমানত? আবার প্রশ্ন আছে ব্যাংক আমানতের মালিকানা নিয়েও। দেখা যাচ্ছে, আমানত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে বড় বড় হিসাবধারীর অ্যাকাউন্টে। এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দরকার। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৫২-৫৩ বছর। ইতোমধ্যে দেশে প্রভূত উন্নতি/উন্নয়ন হয়েছে। বাজেটের আকার অনেক বড় হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬-৭ শতাংশের ঘরে। আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্সের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। রাজস্ব আয় বেড়েছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার অনেক বড়। শিল্প খাত বড় হয়েছে। দারিদ্র্যের যে সীমারেখা আছে, তার নিচের মানুষের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। চালে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শাক-সবজি, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম, তরিতরকারি, ফলমূলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতসব অগ্রগতি/অর্জন, উন্নতি/উন্নয়নের সুবিধা কি সমাজের নিচের স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে অনেক সূচক ব্যবহার করা যায়। এর থেকে একটা জবাব পাওয়া সম্ভব। এসব সূচকের একটি অবশ্যই হতে পারে ব্যাংক আমানত/সঞ্চয় নিয়ে।
এর আগে দেখা যাক খাতটি আকারে কত বড়। দেশে তফশিলি ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। এসব ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ১১ হাজার ২১৯। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যে আরও দেখা যায় ব্যাংক খাতে মোট আমানত ১৭ লাখ ১৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। শহর এলাকায় আমানতের পরিমাণ ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে মোট হিসাব সংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৬৮৪। হিসাবপ্রতি সঞ্চয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৪ টাকা। বলা বাহুল্য, এসবই হচ্ছে গড় হিসাব। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নানাবিধ সমস্যা, যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দরকার, যেমন গ্রামীণ আমানতের বিষয়টি। স্বাধীনতার পর থেকেই বহুদিন ধরে আমরা বলে আসছি গ্রামীণ আমানত মোট আমানতের মোটামুটি ১৮-২০ শতাংশ। এ নিয়েই অনেক প্রশ্ন ছিল। কেন গ্রামীণ আমানত বাড়ছে না? পাশাপাশি অবশ্য অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন গ্রামীণ জনসাধারণের ব্যাংক আমানতের পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এটা কিসের লক্ষণ? ব্যাংক আমানত মানে মানুষের সঞ্চয়। সঞ্চয় হচ্ছে একটা আর্থিক শক্তি। সঞ্চয়ই মানুষ দুঃসময়ে ব্যবহার করে। এ সঞ্চয় যত বাড়বে ততই ভালো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, যদিও তা আশানুরূপ নয়; কিন্তু এর মধ্যে আবার গ্রামীণ আমানতের অবদান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে দেখা যাবে মোট আমানতে গ্রামীণ আমানতের পরিমাণ মাত্র ১৫ শতাংশ। নিশ্চিতভাবেই এটা ভালো লক্ষণ নয়। তবে এখানে একটা প্রশ্ন আছে। গ্রামীণ আমানতের হিসাবায়নে কি সংজ্ঞাগত কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে? এটি হলেও বর্তমানে যে অবস্থা তা আশাপ্রদ নয় বলা যায়।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মোট আমানতের সিংহভাগই ছিল মেয়াদি আমানত। আর কিছু হচ্ছে সঞ্চয়ী আমানত এবং চলতি হিসাবের আমানত। এটা বিশাল একটা পরিবর্তন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে এ চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তখনকার দিনে সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। মেয়াদি আমানতের পরিমাণ ছিল কম। এর অর্থ, তখনকার সময়ে আমাদের পক্ষে টাকা সঞ্চয় করে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না, যা আয় ছিল মোটামুটি তা-ই ছিল ব্যয়। সঞ্চয় ছিল সামান্য; যা ছিল তা আমরা রাখতাম সঞ্চয়ী আমানতে (সেভিংস অ্যাকাউন্ট)। টার্ম ডিপোজিট বা মেয়াদি আমানতে টাকা রাখা বা জমা করার লোকের সংখ্যা ছিল কম। এখন দেখা যাচ্ছে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। মেয়াদি আমানতের পরিমাণ বেশি। সেপ্টেম্বরে ১৭ লাখ ১৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে এফডিআর ছিল ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন আছে। এ ধরনের অ্যাকাউন্টের বৈশিষ্ট্যেরও পরিবর্তন ঘটেছে। আগে দেখা যেত সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের টাকা মানুষ তুলে ফেলত। এখন সেই প্রবণতা কম। লোকে সঞ্চয়ী আমানতে টাকা ধরে রাখে। এ কারণে মেয়াদি আমানত (টার্ম ডিপোজিট) হিসাবায়নের সময় সঞ্চয়ী আমানতের সিংহভাগ টাকা যোগ করা হয়। এসবই আমাদের সঞ্চয়ী বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের লক্ষণ, যা ইতিবাচক। এদিকে দেখা যাচ্ছে, হিসাবপ্রতি গড় আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৪ টাকা। খারাপ না তথ্য হিসাবে। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, এটা গড় হিসাব।



