
ড. হাসনান আহমেদ
১৬ জানুয়ারির পর কোনো কলাম লিখিনি। কোনোক্রমেই লেখায় মন বসাতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম, লিখে যদি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি না করতে পারি, সংশ্লিষ্ট পক্ষ যদি লেখাগুলো আমলে না নেয়, কারও ভাবনার উদ্রেক যদি না হয়, লিখে কী লাভ! এদেশে আমরাই-বা কে! আমাদের তো একচোখা হয়ে তোয়াজ করে কোনো দলভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা নেই, জানি। আজকের পত্রিকার পাতা আগামীকালের ঝালমুড়ি-চানাচুর বিক্রির ঠোঙা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আমার পরিশ্রম ও ভাবনা নিত্য ডাস্টবিনে গড়াগড়ি খায় ভেবে লিখতে অনিচ্ছুক ছিলাম। এর মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। তাই মনকে আবার প্রবোধ দিয়ে আজকে কলম ধরেছি। গত লেখার শিরোনাম ছিল ‘চাই জীবনমুখী, মানবিক ও কর্মমুখী শিক্ষা’ (যুগান্তর, ১৬.০১.২৪)। এ বিষয় নিয়ে নাতিদীর্ঘ কথা বলেছিলাম। এছাড়া অনেকদিন ধরে এদেশের উপযোগী শিক্ষা বিষয়ে ‘শিক্ষার ভিত্তিমূল কী হওয়া উচিত’, ‘শিক্ষার উপকরণ’সহ সামাজিক শিক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অনেক কথাই লিখেছি। এসব লেখা সংশ্লিষ্ট মহলের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেছে কিনা, তা আমার অজানা। আমার ধারণা, এদেশের বাঙালিদের ইংরেজ, আমেরিকান, ভারতীয়, চীনা কিংবা অন্য কোনো ভিনদেশি না বানানো পর্যন্ত আমরা ক্ষান্ত হবো না। এতে আমাদের জাতীয় গর্ব ও অস্তিত্ব ক্রমেই বিলীন হতে বাধ্য। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ মহাদেশের বেশকিছু জাতি কালপরিক্রমায় কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কিছু জাতি অসহায় ও এতিমের মতো নিঃসাড় হয়ে নিঃসীম ভবিষ্যতের অতল গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। পড়ে পড়ে ধুঁকছে। আমরা একটু চোখ তুলে তাকালেই সব দেখতে পাব। এর সঙ্গে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ কথাটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এখানেই আমরা ভুল করি। অতঃপর অদৃষ্টের ওপর দোষ চাপিয়ে হা-হুতাশ করে সামনের দিনগুলো পার করি, যদিও এ সবই প্রকৃতির প্রতিশোধ। এসব চিন্তাভাবনা রাষ্ট্রনায়ক ও দেশ পরিচালকদের সবসময় করা প্রয়োজন। এ সবকিছুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। শিক্ষা আবার নির্ভর করে দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা ও পরিবেশের ওপর। যে জাতি যত শিক্ষিত ও উন্নত, বিশ্বসভায় তার মর্যাদা তত উচ্চ ও টেকসই।
আমাদের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। আছে আলাদা মূল্যবোধ, জাতীয় চেতনা, সামাজিক বুনন-যা এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকেও স্বতন্ত্র। এসব কিছু ভুলে গেলে কিংবা এড়িয়ে গেলে আমরা অন্য কোনো সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, সমাজ-স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয়তাবোধের সঙ্গে কালক্রমে মিশে যাব। এর থেকে দুঃসংবাদের কথা আর কী থাকতে পারে! আমরা বিশ্বের দরবারে স্বকীয় সত্তায় পরিচিত হতে চাই, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, নিজস্ব শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পারঙ্গমতায় ও সক্ষমতায় টিকে থাকতে চাই।
গত দুদিন ধরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১’ বইখানা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। আমার কাছে এর রূপকল্প, অভিলক্ষ্য ও শিক্ষাক্রমের অ্যাপ্রোচ গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। শিক্ষাক্রম উন্নয়নের ভিত্তিও যথাযথ বলে মনে হলো। দার্শনিক ভিত্তি আলোচনায় এসে দেখলাম, ‘শিক্ষার্থীর শিখন হতে হবে আন্তঃবিষয়ক, সমন্বিত এবং প্রক্রিয়া হবে মিথস্ক্রিয়ামূলক’-এগুলো ভালো ভিত্তি। উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শিক্ষাবিজ্ঞানে সাম্প্রতিক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলো-গঠনবাদ ও পুনর্গঠনবাদ। গঠনবাদ অনুযায়ী শিখনের মূল উদ্দেশ্য হলো পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের জন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করা। আর পুনর্গঠনবাদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী শিক্ষার্থী অভিযোজনের জন্য সামাজিক শিখন পরিবেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মিথস্ক্রিয়া ঘটায় এবং এর ফলে শিক্ষার্থী ও শিখন পরিবেশের উভয়ের মাঝেই পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তনের এ অভিজ্ঞতাই শিক্ষার্থীর শিখনের ভিত্তি তৈরি করে।’ বেশ গ্রহণযোগ্য কথা। তবে আমাদের দেশে কি ‘সামাজিক শিখন’ আছে? ‘প্রগতিবাদ ও পুনর্গঠনবাদকে মূল দার্শনিক ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম রূপরেখার কাঠামো ও কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।’ এ বর্ণনায় ‘প্রগতিবাদ’ শব্দটার ব্যবহারের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না। ‘প্রগতিবাদ’ শব্দটা বিভিন্ন দেশে ভিন্নার্থে ব্যবহৃত হয়। ‘প্রগতিশীল’ শব্দটাও ভালো। কে না চায় প্রগতিশীল হতে!



