হাতি লোপ পায় কিন্তু তেলাপোকা টিকে থাকে

সাদিয়া আফরিন

ঢাকা শহরে ঘণ্টায় একটি বিচ্ছেদের খবর কিংবা সাত সমুদ্র পেরিয়ে কানাডার সুদর্শন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বিচ্ছেদ আমাদের দুঃখ দেয়। আহাজারি ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে ভার্চুয়াল আলাপচারিতায়। আমাদের সমাজে বিয়ে ব্যাপারটি যতটা ইতিবাচক ও সুখকর, বিচ্ছেদ ততটাই নেতিবাচক ও বিষাদমাখা।

বিচ্ছেদ বলতেই আমরা বুঝি অসম লিঙ্গের দু’জন মানুষ অর্থাৎ একজন নারী ও একজন পুরুষের বিয়ে বিচ্ছেদ অথবা বিয়ে চুক্তির অবসান। অসম লিঙ্গের বিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেহেতু চিরাচরিত আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে বিয়েকে টিকিয়ে রাখা। বিয়ে ও পরিবার দুটো যেন অবিচ্ছেদ্য। সমাজের চিন্তা পদ্ধতি আমাদের শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়– যে কোনোভাবে বিয়ে টিকলেই পরিবার টিকে থাকবে। বিচ্ছেদ হলে যা সম্ভব নয়।
বিয়ের মতো বিচ্ছেদও আমাদের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিবার বা জ্ঞাতি সম্পর্কের প্রাথমিক ভিত্তি যেহেতু বিয়ে এবং তার ফলে তৈরি হওয়া পরিবার, সেহেতু আমাদের প্রাণান্তকর চাওয়া সমাজের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা। তাই বিয়ে চুক্তির লঙ্ঘন না করা বা বিয়ে টিকিয়ে রাখা। এ জন্য রয়েছে নানা আয়োজন, আরোপণ এবং চাপ। যে বা যিনি বিয়ের সম্পর্কে আছেন, তাঁর চেয়ে যিনি এ সম্পর্ক রাখলেন না বা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এলেন, তিনি যেন এই সমাজের কেউ না; অন্য কেউ। যদি তিনি নারী হন তাহলে মোটেও ‘ভালো নারী’ নন, ‘খারাপ চরিত্রের’। সমাজের কাছে ‘খারাপ নারী’ মানেই তারা, যারা সমাজের চোখে ‘নিন্দিত’, সমাজবহির্ভূত। যেমন বেশ্যা।

শিক্ষিত নারীদের বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে ইদানীং বলা হয়, মেয়েটি ‘অ্যাম্বিশাস বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী’। যেন মেয়েদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকাটাই বিচ্ছেদের কারণ। মেয়েদের অ্যাম্বিশন থাকাটা অপরাধ। এই চাপিয়ে দেওয়া নেতিবাচক তকমাগুলো সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে। তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভায়োলেন্স বা সহিংসতায়। সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক বিষিয়ে উঠবে; মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকবে; ভায়োলেন্স চলতে থাকবে। এক সময় সঙ্গীর পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজনকে লক্ষ্য করেও নানা রকম কাদা ছোড়াছুড়ি, হয়রানি যুক্ত হবে কিন্তু বিচ্ছেদে যাওয়া যাবে না। কেউ একসঙ্গে থাকতে না চাইলে তাঁর সামাজিক ক্ষতি করা হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতে ইদানীং এটি অনেক সহজ হয়ে গেছে। ইচ্ছামতো বা মনগড়া পোস্ট করে দিলেই দিকে দিকে রটে যাবে। হরহামেশা পত্রিকায় আসছে হত্যার মতো ঘটনাও। ফলে যেভাবেই হোক বিয়ে টিকে থাকুক। বিচ্ছেদে যেন জীবন বরবাদ। তাই বিচ্ছেদের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়– এমন কট্টর মনোভাবও দেখা যায় অনেকের মধ্যে।
বিয়ে ও বিচ্ছেদের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানের মধ্যে সম্পর্কের জায়গাটি কোথায়? বিয়ের উদ্দেশ্য কি শুধু চুক্তি টিকিয়ে রাখা? সম্পর্ক বিষাক্ত, নির্যাতনকর, অকার্যকর– তবু বিয়ে ভাঙা যাবে না! পরিবার টিকিয়ে রাখতে হবে! অনেকেই সন্তানের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। তাদের যাতে শুনতে না হয়– তারা ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’র সন্তান! 

অথচ বিয়ের সম্পর্ক আসলে কী? সমাজ বা মূল্যবোধ যে আদর্শ ধারণা দিয়ে থাকুক না কেন, বিয়ে তো আসলে ভালোবাসার মিষ্টি প্রলেপে এক অসম সামাজিক চুক্তি। লিঙ্গীয় রাজনীতি এর পরতে পরতে, যা সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট (এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন-অধস্তন) সম্পর্ক তৈরি করে। এক পক্ষ যতটাই সবল, ক্ষমতাবান; আরেক পক্ষ ততটাই দুর্বল, ক্ষমতাহীন। সুতরাং পারিবারিক সম্পর্ক যে আসলে রাজনৈতিক সম্পর্ক– তা অস্বীকার করার জো নেই। আয় থেকে শুরু করে শ্রম বণ্টন, সন্তান লালনপালন, পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন– সবকিছুতে মিশে আছে রাজনীতি। ঠিক এ কারণে পরিবার সম্পর্কিত মায়া-মমতা-বন্ধনের যে ‘আদর্শ’ ধারণা নিয়ে আমরা বড় হই, তা মূলত কল্পিত। কম পরিবারই হয়তো পাওয়া যাবে, যারা পারিবারিক সম্পর্কের ‘আদর্শ’ ধারণাটি বাস্তবায়িত করতে পেরেছে। সব পারিবারিক সম্পর্কে কোনো না কোনোভাবে ঘটে গেছে নানা অসংগতি। কিন্তু আমরা আদর্শের পূজারি। সম্পর্ককে হিসাবের বাইরে রেখে পরিবার রক্ষার আন্দোলনে নেমে পড়ি। বিচ্ছেদ ঠেকানোকে তাই সামাজিক দায়িত্ব মনে করি।

বিচ্ছেদ বিয়ের মতোই জরুরি। বিচ্ছেদ বিয়ের মতোই সম্পর্কের আরেকটি ধরন মাত্র। কেন বিচ্ছেদ এত বেদনাদায়ক হবে, যদি দু’জন শান্তিপূর্ণভাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে আলাদা হয়ে যান? নাকি আমাদের চিন্তাভাবনায় অন্যকে শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্থান নেই? পরিসংখ্যানও বলছে, ঘণ্টায় একটি বিচ্ছেদ ঘটে যাচ্ছে ঢাকায়। তবে কি পরিবার, সমাজের আরোপণ, সন্তানের দোহাই দিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত অস্বীকার করে যাচ্ছি সত্যিকে?
পশ্চিমা সমাজে হয়তো বিচ্ছেদ ততটা নিন্দনীয়/স্টিগমাটাইজড নয়, যতটা আমাদের সমাজে। আমার সহকর্মী খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের দুটি বিচ্ছেদের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। আলাপ করেন প্রাক্তন দুই স্বামীর সঙ্গে কীভাবে দুটি সন্তান লালনপালন করছেন। আমাদের দেশে এ কথাগুলো খুব হাসির খোরাক জোগায়। এমনকি কেউ যখন বিচ্ছেদের ঘোষণায় বলেন, ‘আমরা অভিন্ন পরিবার হিসেবে থাকব। সন্তানদের দেখাশোনা করব কিংবা পরস্পরের বন্ধু হয়ে থাকব’, মানুষ তখন বুঝতে পারে না বা চায় না। কিন্তু কেন? প্রশ্ন করেছি কখনও? দু’জন ভিন্ন মানুষ, আলাদা ব্যক্তিসত্তা নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে পারেন। কেন আমরা ধরে নিই বিচ্ছেদ মানেই তাদের পরস্পরের শত্রু হয়ে চলতে হবে? 

কারণ এ ভাবনাগুলো আমরা শিখে এসেছি। শিখে এসেছি– যে তোমাকে ছেড়ে গেল, সে আসলে তোমার ক্ষতি করেছে কিংবা যাকে তুমি ছেড়ে দিলে, সে তোমার জন্য ক্ষতিকর ছিল। সুতরাং তাকে দুশমনরূপে গণ্য কর, হেয় কর। তাঁকেসহ পারলে তাঁর পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের চরিত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কর। একভাবে বিচ্ছেদ তাই সামাজিক ব্যবচ্ছেদ।
বিচ্ছেদকেন্দ্রিক আরেকটি ধারণা হলো, ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’। শিশু ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান’ হিসেবে বড় হবে– তা যেন আমাদের মরমে মেরে ফেলে। কিন্তু এই টার্ম আসলে বিচ্ছেদকে অস্বাভাবিক বলে দেখার ফল। ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’ কি শুধু মা-বাবার বিচ্ছেদ হলেই তৈরি হয়? কত শত পরিবার রোজ ভেঙে পড়ে অথবা ভেঙে আছে। আমরা কিছু দেখি, কিছু দেখি না। ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’ হওয়া লজ্জার। কিন্তু এমন কোনো আইন বা সমাজ তৈরি করতে এগিয়ে আসি না, যেখানে মা-বাবা শুধু সন্তানের জন্য ক্লান্তিকর জীবন বয়ে বেড়াবেন না। যেখানে লোকনিন্দার ভয়ে নিজের অবস্থান অবলম্বন করে বাঁচতে পিছপা হবেন না। মা-বাবার বিচ্ছেদ সন্তানের দেখাশোনায় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। শুধু এ কারণে হলেও বিচ্ছেদ-পরবর্তী সময়ে মা-বাবা দু’জন শত্রুতার বদলে পারস্পরিক সহযোগিতা ধরে রাখবেন।

আমরা তা পারি না। আমরা যেহেতু শিখে এসেছি বিবাদ হলেই হইচই করে পাড়া মাথায় তুলতে। নিজের রাগ, ঘৃণা সর্বস্ব দিয়ে মানুষকে বোঝাতে চাই– আমার সঙ্গী কতটা জালিম, বিপরীতে আমি কতটা ফেরেশতা। সুতরাং কেন আমি সহযোগী মনোভাব নিয়ে সন্তান লালনপালন করতে এগিয়ে যাব? আমি বরং সঙ্গীকে নানাভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করব। যেমন– সঙ্গীর ফোন না ধরা, ব্লক করে রাখা। সন্তানের আর্থিক প্রয়োজনে সাহায্য না করা, পরিবারের লোকজন, বন্ধুদের ফোন করে পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরা ইত্যাদি। বিয়ের সম্পর্কের ভেতর যেখানে সম্মান দিতে বা পেতে শিখিনি, সেখানে প্রাক্তনের মান-সম্মান নিয়ে ভাবার অবকাশ কই? ফলে যারা বিচ্ছেদের পরও এক পরিবার হিসেবে থাকতে চান বা বন্ধু হিসেবে থাকতে চান, সেসব আমাদের কাছে ভন্ডামি, হাস্যকর মনে হবেই!

আদতে পরিবার ও সম্পর্কের একক কোনো চেহারা কি আছে? যে চেহারা বা রূপ আমরা জোর করে ধরে রাখতে চাই, সে চেহারা কি সর্বজনীন? খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমার পরিবারের সঙ্গে আমার পাশের পরিবারটিরই কোনো মিল নেই। আমাদের সমাজেই আছে নানা রকম পরিবার। একক ধারণা হিসেবে যে অসম লিঙ্গীয় বিয়ের ধারণা টিকে আছে, তা মূলত কল্পিত। তা ছাড়া পরিবার ব্যবস্থার মধ্যেও প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে শুধু অসম লিঙ্গের বিয়ে, পরিবার, সম্পর্ক নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে কেন? চাপিয়ে দেওয়া দৃষ্টিভঙ্গির এই সমাজ আমাকে আপনাকে দেখায় বিচ্ছেদ নামক জুজুর ভয়। যে জুজুর ভয়ে অতিকায় হাতি (সম্পর্ক) লোপ পায় কিন্তু তেলাপোকা (বিয়ে) টিকে থাকে।  

সাদিয়া আফরিন: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

সৌজন্যে- সমকাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top