নির্বাচনে জাতিসংঘের ভূমিকা রাখার সুযোগ কতটুকু

স্নায়ুযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, কম্বোডিয়ার সরকারের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করেছে খেমাররুজসহ যুদ্ধরত তিন দল। সেই চুক্তির আওতায় জাতিসংঘের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেদেশে নির্বাচনের আয়োজন করে, যেখানে ভোট পড়েছিল ৮৯.৫৬ শতাংশ। এর পরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইন্দোনেশিয়া থেকে পৃথক হওয়ার পূর্ব তিমুরের গণভোটও আয়োজিত হয়েছে। সেটাও হয়েছিল আরেকটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। নামিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে একসময় জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হয়েছে।

কিন্তু গত এক দশকে জাতিসংঘের সেই ভূমিকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সংস্থাটির নীতিমালাতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের জের ধরে কোন দেশের নির্বাচনে জাতিসংঘের এগিয়ে আসার উদাহরণ কি রয়েছে?

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে করতে প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধির কাছে মার্কিন কংগ্রেসের ১৪ জন একটি চিঠি পাঠানোর পর এই বিতর্ক শুরু হয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা এই চিঠি পাঠালেন এমন সময় যখন বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ এবং ‘জনগণকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিতে’ উদ্যোগ নেয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চিঠি দিয়েছিলেন কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য।

কিন্তু জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কোন দেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত বলতে আসলে কী বোঝানো হয়? বিশ্বের কোন কোন দেশে এভাবে নির্বাচন হয়েছে? কী প্রক্রিয়াতেই বা জাতিসংঘ এরকম নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে?

ইতিহাস ঘেঁটে এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছে বিবিসি বাংলা।

যেসব পদ্ধতিতে জাতিসংঘ নির্বাচনে সহায়তা করে থাকে

কোন দেশের নির্বাচনে জাতিসংঘের ভূমিকা কী হতে পারে, কীভাবে হবে, এ নিয়ে গত বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি একটি নীতিমালা তৈরি করেছে জাতিসংঘ।

ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্ট: সুপারভিশন, অবজারভেশন, প্যানেল অ্যান্ড সার্টিফিকেশন শিরোনামের ওই দলিলে নির্বাচনে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্বাচনে সহায়তা সংক্রান্ত দলিলপত্রে বলা হয়েছে, কোন দেশের নির্বাচন জাতিসংঘ শুধুমাত্র তখনি তত্ত্বাবধান করতে যাবে যদি ওই দেশ সহায়তার অনুরোধ করে অথবা নিরাপত্তা পরিষদে বা সাধারণ পরিষদে এ সংক্রান্ত কোন প্রস্তাব পাস করা হয়।

কোন দেশের নির্বাচনে কয়েকভাবে জাতিসংঘ সহায়তা করতে পারে। কখনো কখনো এসব পদ্ধতি একসাথেই কার্যকর হতে পারে, আবার আলাদা আলাদাও হতে পারে। এসব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে:

  • জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের আয়োজন
  • নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো
  • বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শ ও নজরদারি করা
  • নির্বাচন সম্পর্কে স্বীকৃতি দেয়া বা না দেয়া

এর বাইরে কারিগরি সহায়তা দেয়া, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাজে সহায়তার মতো কাজও জাতিসংঘ করে থাকে।

এসব লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন, শান্তি রক্ষা এবং বিশেষ রাজনৈতিক মিশনও পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু চাইলেই জাতিসংঘ এসব করতে পারবে না, সেজন্য অবশ্যই নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের ম্যান্ডেট লাগবে। সেই সঙ্গে ওই দেশের সমর্থনও থাকতে হবে।

জাতিসংঘের দলিলে বলা হয়েছে, ‘’কোন দেশের রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সেদেশের নির্বাচন আয়োজনে সরকার জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেই হবে না, সেজন্য অবশ্যই ওই দেশে জাতিসংঘের এরকম দায়িত্ব পালনে জনগণের সমর্থন থাকতে হবে।‘’

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, যদিও একসময়ে নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ করার মতো মূল দায়িত্বগুলো পালন করতো জাতিসংঘ, কিন্তু বর্তমানে এটা খুব কমই করা হয়। বরং নির্বাচন আয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বল্প ও মধ্য মেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই বিশেষ সহায়তা করা হয়।

নানা দেশে যেভাবে নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে জাতিসংঘ

ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স: সুপারভিশন, অবজারভেশন, প্যানেল অ্যান্ড সার্টিফিকেশন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কখন কোন দেশের নির্বাচনের প্রধান অনুষঙ্গগুলো জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হবে।

উনিশশো পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে যখন উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হতে একের পর এক দেশ স্বাধীনতার জন্য গণভোটের আয়োজন করতে শুরু করে, তখন থেকে জাতিসংঘের এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

সেখানে জাতিসংঘ মূলত নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে যে, যাতে সবাই কোন রকম বাধা ছাড়াই নিজের মতামত ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন।

সেই সময় জাতিসংঘের একজন তত্ত্বাবধানকারী কমিশনার বা ছোট একটি প্যানেল বা কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচনের কাজ তদারকি করা হয়। মূলত সেই দেশের কর্মকর্তারাই নির্বাচনের কাজ করেন, কিন্তু এই কমিশন নজরদারি করে, পরামর্শ দেয়, পর্যালোচনা করে। নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কমিশনের অনুমোদন থাকতে হয়। কিন্তু খুব বিরল ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে জড়িত হয় জাতিসংঘ। সর্বশেষ এ ধরনের নির্বাচন আয়োজিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে নামিবিয়ায়। এছাড়া ২০০১ সালের পূর্ব তিমুরের পার্লামেন্টারি নির্বাচন ও ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জাতিসংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের অংশগ্রহণের আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে পর্যবেক্ষক দল পাঠানো, যদিও এটাও এখন খুব একটা পাঠানো হয় না। এজন্যও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন লাগে। পর্যবেক্ষক দল নিজেরা সরাসরি নির্বাচনের কোন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না, কিন্তু যথাযথভাবে নির্বাচন হচ্ছে কিনা, সেটা নজরদারি করে। এর ভিত্তিতে তারা নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু এবং অবাধ হয়েছে, সেই বিষয়ে সরাসরি জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে প্রতিবেদন দেয়।

যদিও এই পর্যবেক্ষণের যে মতামত দেয়া হবে, তাতে আইনগত কোন বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। কিন্তু ওই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা অনেকাংশে এই মতামতের ওপর নির্ভর করে। তবে যেসব দেশের নির্বাচনে জাতিসংঘ কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে, সেসব দেশে সাধারণত এরকম পর্যবেক্ষক মিশন পাঠায় না জাতিসংঘ।

পুরো প্রতিবেদনটি পড়ুন বিবিসি বাংলা থেকে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top